দেশের প্রধান ধান মৌসুম আমনের জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের সময় এখন। চারা লাগানোর পরে কৃষককে কয়েক ধাপে সার প্রয়োগ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবে এই সময়ে সারের চাহিদা বেড়ে যায়, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো এলাকায় কৃষকদের বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। অথচ সরকারি নথি অনুযায়ী চাহিদার তুলনায় মজুত ও বরাদ্দে কোনো ঘাটতি নেই বলে জানা যাচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হলেও তারা সার উত্তোলন করছে না, ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। ডিলাররা ঠিকমতো সার উত্তোলন ও বিতরণ করছেন কি না তা তদারক করার দায়িত্ব রয়েছে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার। কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত পরিবেশকরা ভর্তুকির সার কালোবাজারে পাচার করছে, পরে তা খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। গত তিন দিনে রাজশাহীর চার উপজেলায় এক এলাকার সার অন্য এলাকায় পাচারের অভিযোগে চার পরিবেশককে মোট ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যশোরে বেশি দামে সার বিক্রির দায়ে গত ২ আগস্ট দুই পরিবেশককে সাড়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি মাসে জেলাভিত্তিক সার বরাদ্দের আদেশ জারি হয়। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সার বরাদ্দ ও বীজ বিতরণ মনিটরিং কমিটি ডিলারভিত্তিক বরাদ্দ দেয়। এরপর ডিলার নির্ধারিত গোডাউন থেকে সার উত্তোলন করে। বরাদ্দের সার সঠিক সময়ে উত্তোলন হচ্ছে কি না এবং কতজন কৃষককে কতটুকু সার দেওয়া হচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার। সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার ডিলার সার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তে মাঠ পর্যায়ের গাফিলতির বিষয়টি সামনে এসেছে। অতিরিক্ত সচিব (সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ) আহমেদ ফয়সল ইমাম বলেন, "মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা আমাদের হাত-পা। মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আমরা আমদানি, বরাদ্দ সঠিক পরিমাণে ও সঠিক সময়ে করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশ সংকট তৈরি করছে।" দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত শনিবার জেলা পর্যায়ের তিন উপপরিচালককে বদলি করা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ দর্শানো, ব্যাখ্যা তলব, প্রত্যাহার ও ক্ষেত্রবিশেষে বরখাস্তের ঘটনাও ঘটছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আগস্ট মাসের জেলাভিত্তিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বরাদ্দ থাকলেও উত্তোলন হচ্ছে অনেক কম। ঢাকা বিভাগের গাজীপুরে আগস্টে ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৮৭৬ মেট্রিক টন, কিন্তু ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৮০০ মেট্রিক টন। নরসিংদীতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৫৫৩ মেট্রিক টন, বিতরণ হয়েছে ৯১৯ মেট্রিক টন। ঢাকা বিভাগের ৮ জেলায় বরাদ্দ ছিল ১৯ হাজার ৯১৮ মেট্রিক টন, উত্তোলন হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৯৬৫ মেট্রিক টন। ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলায় বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ৪২৫ মেট্রিক টন, উত্তোলন হয়েছে ৯ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। সিলেট বিভাগের চার জেলার জন্য বরাদ্দ ৯ হাজার ৫৪১ মেট্রিক টন হলেও ২০ আগস্ট পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৬৭৯ মেট্রিক টন। টিএসপি সারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। কুমিল্লায় বরাদ্দ ১ হাজার ৩২৭ মেট্রিক টনের বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৪৯৮ মেট্রিক টন। খুলনার চার জেলায় বরাদ্দ ৪ হাজার ৩৩৭ মেট্রিক টন, বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৬৩৭ মেট্রিক টন।
সারা দেশে আগস্টের জন্য ইউরিয়া সারের বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন। ২০ আগস্ট পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬১২ টন। গত রোববার কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। কুড়িগ্রামে আগস্টে বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন, ডিলাররা তুলেছেন মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ। ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির ক্ষেত্রেও উত্তোলন অনেক কম বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম।
সরকারের দুটি সংস্থা—বিসিআইসি ও বিএডিসি—পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও সার আমদানি হয়। বিসিআইসি ইউরিয়া সার এবং বিএডিসি নন-ইউরিয়া সার আমদানি করে। বিএডিসির আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টিএসপির চাহিদা ৬৯ হাজার মেট্রিক টনের বিপরীতে মজুত ৩ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। ডিএপির চাহিদা ৮৯ হাজার মেট্রিক টন, মজুত ৩ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। এমওপির চাহিদা ৭৮ হাজার মেট্রিক টন, মজুত ১ লাখ ৪৮ হাজার টন। ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬ লাখ মেট্রিক টন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মজুত ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ছাদেকা হক বলেন, সংকটটি প্রকৃত ঘাটতির কারণে নয়, বরং সরবরাহ-চেইনের ত্রুটির কারণে। ডিলাররা বরাদ্দকৃত সার নির্ধারিত সময়ে উত্তোলন করছেন না, আবার এক পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে একাধিক ডিলারশিপ নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন কেউ কেউ। নিয়ম ভাঙলেও ডিলারশিপের লাইসেন্স বাতিল হচ্ছে না। তিনি সার উত্তোলনের কঠোর সময়সীমা, ডিজিটাল রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, শাস্তির প্রয়োগ, পূর্ববর্তী ডিলারশিপ অডিট এবং বিকল্প বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।




