পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা এক থাকলেও নিউট্রনের সংখ্যার ভিন্নতার কারণে যে পদার্থ তৈরি হয়, তাকে আইসোটোপ বলা হয়। ইউরেনিয়াম-২৩৫ কিংবা বোরন-১০ এবং বোরন-১১ এর মতো অনেক মৌলিক পদার্থের আইসোটোপ প্রকৃতিতে বিদ্যমান। তবে সব আইসোটোপ এক নয়; কিছু নির্দিষ্ট আইসোটোপ থেকে বিকিরণ নির্গত হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় তেজস্ক্রিয়তা বা রেডিওএক্টিভিটি বলা হয়। ল্যাটিন শব্দ 'রেডিও' থেকে আসা এই বিকিরণের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও চমকপ্রদ।

তেজস্ক্রিয়তার একটি উদাহরণ হিসেবে বোরন-১২ এর কথা বলা যেতে পারে। বোরন-১১ এর নিউক্লিয়াসে যদি একটি অতিরিক্ত নিউট্রন যোগ করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা স্থিতিশীল থাকে না এবং তৎক্ষণাৎ ভেঙে পড়ে। এই ভাঙন প্রক্রিয়ায় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার বেগে দুটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন একত্রে বেরিয়ে আসে, যাকে পদার্থবিদরা 'আলফা কণিকা' এবং এর প্রবাহকে 'আলফা বিকিরণ' বলে অভিহিত করেন।

তবে এই প্রক্রিয়ায় কেবল আলফা কণিকা বেরিয়ে আসাই শেষ কথা নয়। বোরন-১২ এর ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি নিউট্রন প্রোটনে রূপান্তরিত হয়, যার ফলে একটি অতিরিক্ত ইলেকট্রন তৈরি হয়। এই ইলেকট্রনটি আলোর গতিতে (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার) পরমাণু থেকে বেরিয়ে যায়, যাকে বলা হয় 'বিটা কণিকা' এবং এর প্রবাহকে 'বিটা রেডিয়েশন' বলা হয়। এছাড়া, নিউক্লিয়াস ভেঙে যাওয়ার সময় গামা রশ্মিও বিকিরিত হয়। গামা রশ্মি এক্স-রের মতোই, তবে এটি যেকোনো বাধা ভেদ করে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সক্ষম। অর্থাৎ, বোরন-১২ থেকে আলফা, বিটা এবং গামা—তিন ধরনের বিকিরণই পাওয়া সম্ভব, যদিও সব তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ এই তিন ধরনের বিকিরণ দেয় না।

তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের স্থায়িত্ব নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানে 'হাফ লাইফ' বা অর্ধ-জীবন নামক একটি ধারণা রয়েছে। এর অর্থ হলো, একটি রেডিও আইসোটোপের অর্ধেক পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে যেতে যে সময় লাগে। যেমন, বোরন-১২ এর হাফ লাইফ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, যা চোখের পলকেই বিলীন হয়ে যায়। অন্যদিকে, ভারী ধাতু থোরিয়াম-২৩২ এর অর্ধেক পরমাণু ভাঙতে সময় লাগে প্রায় এক হাজার চারশত কোটি বছর। লোহার ক্ষেত্রেও ভিন্ন ভিন্ন হাফ লাইফ সম্পন্ন ছয়টি রেডিও আইসোটোপের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যার সময়সীমা সাড়ে পাঁচ মিনিট থেকে শুরু করে তিন লাখ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

বর্তমানে এক হাজারের বেশি আইসোটোপ আবিষ্কৃত হয়েছে, যার অনেকগুলোই ল্যাবরেটরি বা রিঅ্যাক্টরে কৃত্রিমভাবে তৈরি। এই জ্ঞান বাস্তব জীবনে অত্যন্ত কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ, প্রকৃতিতে পাওয়া কার্বন-১৪ আইসোটোপ প্রত্নতত্ত্ববিদদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। মানুষ, প্রাণী এবং উদ্ভিদে এই রেডিওএক্টিভ কার্বনের উপস্থিতি থাকে। কোনো প্রাচীন কাঠের কয়লা বা জৈব অবশেষের কতটি কার্বন নিউক্লিয়াস অক্ষত আছে এবং কতটি ভেঙে গেছে, তা বিশ্লেষণ করে ওই বস্তুটি কত প্রাচীন বা তা কত বছর আগে ব্যবহৃত হয়েছিল, তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়।