বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কিছুটা কমে যাওয়াকে সাধারণত স্বাভাবিক মনে করা হলেও, সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে যে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস মস্তিষ্কের সুস্থতায় বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে পারে এমন খাবার গ্রহণ করলে স্মৃতিভ্রংশ বা মেমোরি লস-এর ঝুঁকি হ্রাস পায়, এমনকি যাদের আলঝেইমার্স রোগের জেনেটিক ঝুঁকি রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে।

সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ‘এইজিং রিসার্চ সেন্টার’ দ্বারা পরিচালিত এই গবেষণাটি চিকিৎসা সাময়িকী ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১,৮০০ জনেরও বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের কোনো স্মৃতিজনিত সমস্যা ছিল না। গবেষকেরা দীর্ঘ ছয় বছর তাদের খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করেন এবং রক্তে আলঝেইমার্স ও স্নায়ুকোষের ক্ষতির সংকেত বহনকারী তিনটি বিশেষ উপাদানের মাত্রা পরিমাপ করেন। পরবর্তী ১৫ বছর পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণের পর দেখা যায়, ২৪০ জনের স্মৃতিশক্তি কমেছে। তবে যাদের খাদ্যাভ্যাস ছিল প্রদাহরোধী, তাদের ক্ষেত্রে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি অনেক কম ছিল। বিশেষ করে যাদের রক্তে ‘পি-টাউ ২১৭’ উপাদানের মাত্রা বেশি ছিল, তারা প্রদাহরোধী খাবার খাওয়ার ফলে স্মৃতি হ্রাসের ঝুঁকি ২৯ শতাংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রদাহরোধী খাদ্য বলতে নির্দিষ্ট কোনো একটি খাবারের তালিকা নয়, বরং একটি সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে বোঝায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ব্যক্তি নিয়মিত শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, ডাল এবং পূর্ণ শস্যযুক্ত খাবার খেয়েছেন, তাদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো থেকেছে। বিপরীতে, অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং রেড মিট বা লাল মাংসের পরিমাণ কম রাখা স্মৃতিশক্তি রক্ষায় সহায়ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে হঠাৎ কোনো নতুন উপাদান যোগ করার চেয়ে ছোট ছোট পরিবর্তন, যেমন—মিষ্টির বদলে ফল খাওয়া বা প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকসের বদলে বাদাম বেছে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদী সুফল দেয়।

শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রদাহ প্রয়োজন হলেও, দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ রক্তনালির ক্ষতি করে এবং স্নায়ুকোষকে আঘাত করে, যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তবে স্মৃতিভ্রংশের পেছনে কেবল খাদ্য নয়, বংশগত কারণ, ধূমপান, মদ্যপান এবং শ্রবণশক্তি হ্রাসের মতো বিষয়গুলোও প্রভাব ফেলে।

সিএনএন-এর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লিয়ানা ওয়েন সতর্ক করেছেন যে, এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা, তাই একে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নেওয়া ঠিক হবে না। সুইডেনের মানুষের ওপর করা এই গবেষণার ফল অন্য দেশের ভিন্ন জীবনযাপন ও বংশগত বৈশিষ্ট্যের মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। এছাড়া অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া তথ্যের নির্ভুলতার বিষয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে।

মস্তিষ্কের পূর্ণ সুস্থতার জন্য খাবারের পাশাপাশি আরও কিছু অভ্যাসের কথা বলা হয়েছে। রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং ধূমপান বর্জন করা উচিত। শুধু শারীরিক যত্ন নয়, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা, নতুন দক্ষতা শেখা এবং স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।