বর্তমানে আমরা স্মার্টফোনে যে ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি তুলি, সেই প্রযুক্তির জন্ম হয়েছিল গবেষণাগারে। তবে সেটি যে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত করা ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। নাসা-র জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরিতে (JPL) নব্বইয়ের দশকে কর্মরত থাকাকালীন একদল গবেষক তৈরি করেছিলেন 'ক্যামেরা-অন-এ-চিপ'। এই যুগান্তকারী উদ্ভাবনের ফলে ক্যামেরার বড় আকারের যন্ত্রাংশের বদলে ব্যবহৃত হতে শুরু করে ক্ষুদ্র সেমিকন্ডাক্টর ইমেজ সেন্সর। এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয় কমপ্লিমেন্টারি মেটাল-অক্সাইড-সেমিকন্ডাক্টর (CMOS) ইমেজ সেন্সর, যা বর্তমানে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং স্বয়ংচালিত গাড়ির ক্যামেরায় ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭০ কোটি সিএমওএস ইমেজ সেন্সর উৎপাদিত হয়।
তবে এই প্রযুক্তি কেবল উদ্ভাবন করেই শেষ হয়ে যেত, যদি তা বাজারে আনার পথ খোলা না থাকত। লেখক উল্লেখ করেন, ১৯৮০ সালে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া 'বাইহ-ডোল অ্যাক্ট' (Bayh-Dole Act) এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। এই আইনের ফলে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত উদ্ভাবনের পেটেন্ট অধিকার বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ছোট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ পায়। এর ফলে গবেষণাগারের আবিষ্কারগুলো বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হয়।
বাইহ-ডোল অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার আগে সরকারি অর্থায়নে তৈরি উদ্ভাবনের মালিকানা সাধারণত সরকারের হাতে থাকত। ফলস্বরূপ, ১৯৮০ সাল নাগাদ সরকারের মালিকানাধীন প্রায় ২৮ হাজার পেটেন্টের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশের বাণিজ্যিক লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় আবিষ্কার সাধারণ মানুষের উপকারে আসেনি। কিন্তু এই আইন চালুর পর দৃশ্যপট বদলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে ২১ হাজারেরও বেশি স্টার্টআপ কোম্পানি গড়ে উঠেছে, ২০০টির বেশি নতুন ওষুধ ও ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে এবং মার্কিন অর্থনীতিতে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখা হয়েছে।
স্মার্টফোন ক্যামেরার ক্ষেত্রেও এই আইনের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। গবেষক দলটি যখন জেপিএল-এ তাদের উদ্ভাবন শেষ করেন, তখন ডক্টর সাবরিনা কেমেনি এবং লেখক মিলে 'ফটোবিট কর্পোরেশন' প্রতিষ্ঠা করেন। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে তারা এই উদ্ভাবনের একচেটিয়া লাইসেন্স পান, যা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং গবেষণাগারের বাইরে পণ্যটি নিয়ে আসতে সাহায্য করে। পরবর্তী সময়ে তারা এই সেন্সরটিকে আরও উন্নত করেন এবং ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিগুলোকে এই নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎসাহিত করেন। লেখক পরবর্তীতে ডার্টমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে এবং 'গিগাজট টেকনোলজি'র সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আরও অনেক উদ্ভাবককে তাদের আবিষ্কার বাণিজ্যিক করতে সাহায্য করেছেন।
তবে বর্তমান সময়ে এই সফল ব্যবস্থার সামনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বেশ কিছু সরকারি সংস্থা গবেষণা অনুদান এবং মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত নিয়মে সংস্কারের কথা ভাবছে। কিছু প্রস্তাবনায় লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় সংস্থাসমূহের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, এমনকি কেউ কেউ বাইহ-ডোল ফ্রেমওয়ার্কটি পুরোপুরি বাতিল করার প্রস্তাব দিয়েছেন। লেখকের মতে, প্রযুক্তি স্থানান্তরের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো নিয়মের স্থায়িত্ব ও স্বচ্ছতা। বিনিয়োগকারী এবং গবেষকদের এই আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন যে, দীর্ঘমেয়াদী উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত নিয়মগুলো হঠাৎ বদলে যাবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, যা সঠিকভাবে কাজ করছে তা পরিবর্তন করার চেষ্টা না করে বর্তমান সফল ব্যবস্থাকেই রক্ষা করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতের বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলো বাধাগ্রস্ত না হয়।




