দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে। মঙ্গলবার দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আকতারুল ইসলাম জানান, ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির নামে সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার জন্য অর্থ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোনো কেনাবেচা না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এই ধরনের লেনদেনে মোট ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে ২৭টি ডিলের মাধ্যমে ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। দুদকের অভিযোগ, এসব অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশে পাচার করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা মিলায় কমিশন তিনটি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মামলাগুলোতে আলাদাভাবে ১৬ জন, ১৬ জন ও ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। কয়েকজন একাধিক মামলায় জড়িত থাকায় মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯। সাইফুজ্জামানের স্ত্রী ও আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামানসহ কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এসব মামলার আসামি।

প্রথম মামলাটি ২০১৮ সালের ২০ মার্চের একটি লেনদেন সংক্রান্ত। আরামিট সিমেন্টের আবেদনের ভিত্তিতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে একটি ডিল করা হয়। এই ডিলের মাধ্যমে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় মামলাটি ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ১৭টি ডিল নিয়ে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কামাল বাজার শাখায় ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে করা এসব ডিলের মাধ্যমে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এই মামলায়ও ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তৃতীয় মামলাটি ২০২০ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৯টি ডিল নিয়ে গঠিত। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সদরঘাট শাখার ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে করা এসব ডিলে গ্রাহকের নিজস্ব অংশ বাদ দিয়ে ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে এবং এই মামলায় ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনটি মামলার অর্থের পরিমাণ যোগ করলে দাঁড়ায় ১৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যদিও দুদকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মোট অঙ্ক ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনটি মামলাতেই সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী রুকমীলা জামান, আরামিট সিমেন্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম, ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী হিসেবে চিহ্নিত মো. আব্দুল আজীজ এবং আরামিট সিমেন্টের এজিএম এ কে এম মারুফের নাম রয়েছে। মামলায় আরামিট সিমেন্ট, ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগ, তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী থাকাকালীন সাইফুজ্জামান ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাংকঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রেখেছিলেন। ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য না হয়েও তিনি পর্ষদের সভায় অংশ নিতেন এবং সিদ্ধান্ত দিতেন। আরামিট গ্রুপের কর্মচারীদের ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী দেখিয়ে ডিল অনুমোদন করানোর অভিযোগও আনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আরামিট গ্রুপের এজিএম এবং সাইফুজ্জামানের ব্যক্তিগত সহকারী মো. আব্দুল আজীজকে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক হিসেবে দেখিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানকে সিমেন্টের কাঁচামালের সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত করা হয়। প্রকৃতপক্ষে কোনো মালামাল সরবরাহ করা হয়নি বলেও দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থ বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর, আংশিক নগদে তোলা এবং কিছু অর্থ আগের দায় পরিশোধে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের নথি অনুযায়ী, টাকার একটি অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাচার করে সেখানে সম্পদ কেনা হয়েছে। পরবর্তীতে সেখান থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তরেরও অভিযোগ রয়েছে। এসব লেনদেনের 'আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি' বা চূড়ান্ত সুবিধাভোগী ও মূল হোতা হিসেবে সাইফুজ্জামানকে চিহ্নিত করেছে দুদক। রুকমীলা জামানের বিরুদ্ধেও ঋণ অনুমোদনে প্রভাব খাটানো এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, আরামিট সিমেন্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পণ্য সরবরাহ না হওয়া সত্ত্বেও ডিল অনুমোদনের আবেদন করার অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পণ্য সরবরাহ যাচাই না করে অফিস নোট, পে-অর্ডার ও বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করে অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।