অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থিত ব্যাংকসটাউন আর্টস সেন্টারে সম্প্রতি মঞ্চস্থ হয়েছে ‘লেট মি ফ্লাই’ নামক একটি নাটক, যা অভিবাসী নারীদের জীবনের অপ্রকাশিত দুঃখ, পারিবারিক সহিংসতা এবং মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছে। ইংরেজি সংলাপে পরিবেশিত এই নাটকটি স্থানীয় দর্শক ও নীতিনির্ধারকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন জন মার্টিন এবং সূত্রধরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মৌসুমী মার্টিন।
প্রযোজনাটির মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন সংস্কৃতি ও দেশ থেকে আসা অভিবাসী নারীদের দীর্ঘদিনের জমানো যন্ত্রণা ও না-বলা কথাগুলোকে একটি সাহসী ভাষায় মঞ্চে উপস্থাপন করা। মৌসুমী মার্টিন জানান, যেসব নারী সামাজিক ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না, তাঁদের জীবনের সত্য যখন মঞ্চে ফুটে ওঠে, তা একজন শিল্পীর জন্য অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক। একসময় ঢাকার নাট্যাঙ্গনে পরিচিত মুখ এই দম্পতি প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝেও দীর্ঘকাল ধরে সংস্কৃতিচর্চাকে ধরে রেখেছেন।
নাটকটির কাঠামো তৈরিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং গভীর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে টানা পাঁচ মাস পরিশ্রম করা হয়েছে। পরিচালক জন মার্টিন, যিনি একসময় ঢাকার পদাতিক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তিনি জানান যে মূলধারার সমাজের তুলনায় অভিবাসী সমাজে পারিবারিক নির্যাতনের স্বরূপ কিছুটা ভিন্ন। তিনি এই নাটকটিকে একটি প্রার্থনার সাথে তুলনা করে বলেন, তিনি চেয়েছিলেন নীতিনির্ধারকেরা যেন এই তীব্র মানবিক যন্ত্রণাকে সরাসরি অনুভব করতে পারেন এবং বিষয়টি বুঝতে পারেন।
ব্যাংকসটাউন আর্টস সেন্টারের এই পরিবেশনায় কেবল সংলাপ নয়, বরং গান, কবিতা এবং দর্শকদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে যুক্ত করা হয়েছিল। পারিবারিক সহিংসতার পাশাপাশি অভিবাসনের ফলে সৃষ্ট মানসিক অভিঘাত এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতাগুলো এখানে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। মঞ্চসজ্জায় বন্দিত্ব ও মুক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত খাঁচাবন্দী ও ডানা ভাঙা পাখির ব্যানারটি এঁকেছেন বাংলাদেশি শিল্পী কীরিটি রঞ্জন বিশ্বাস এবং কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছেন আনিসুর রহমান।
নাটকটি দেখার পর সিডনিপ্রবাসী নাট্যব্যক্তিত্ব গোলাম মোস্তফা জানান, মৌসুমী মার্টিনের বাচনভঙ্গি এবং অভিবাসী নারীদের বাস্তবধর্মী অভিনয় তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। লেবানিজ মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগ এবং ক্যান্টারবারি-ব্যাংকসটাউন কাউন্সিলের সহযোগিতায় এই নাটকটি সফলভাবে মঞ্চস্থ হয়। এতে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পাশাপাশি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নারীরা অভিনয় করেছেন। অভিনয়শিল্পী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফয়জুন পল্লী, আসনান নেহেরিন, ওলায়িংকা অ্যাশলে, সাহানা অভিজিৎ, ঋষিতা মার্টিন, উম্মুল বানিন আব্দুল্লাহি, সাজেদা বিলকিস আব্দুল্লাহি এবং ফৌজিয়া নাফিসার মতো প্রতিভাবানরা। ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির এই নারীদের মাধ্যমে নির্যাতনের গণ্ডি পেরিয়ে মর্যাদার সাথে বাঁচার স্বপ্নটিই মঞ্চে প্রতিফলিত হয়েছে।




