ফ্যাশন দুনিয়ায় ধীরে ধীরে বদলের হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিন ধরেই পোশাকের সাথে আরামদায়ক স্পোর্টি ট্রেনার এবং বড়সড় চকচকে গয়নার চল ছিল। তবে আসন্ন শরৎ ও শীত মৌসুমে সেই ধারা থেকে সরে এসে ফিরে আসছে নান্দনিক সূক্ষ্মতা। জুতা এবং গয়না—দুটো ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে নতুন প্রবণতা, যেখানে আরামের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে মার্জিত চেহারা। জার্মান শু ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ক্লডিয়া শুলৎসের মতে, এ বছর জুতার নকশায় আসছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বুট এবং অ্যাঙ্কল বুটের আকৃতি হবে আগের তুলনায় সরু, লাস্ট হবে আরও সংকীর্ণ এবং কাটও হবে অধিকতর সূক্ষ্ম। ট্রেনারের জায়গা দখল করতে এগিয়ে আসছে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা বুট, এমনকি ওভার-দ্য-নি বুটও। ওয়েস্টার্ন বুটের জনপ্রিয়তাও অটুট থাকছে, তবে এবার সেটিকে কাউবয় লুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ছোট কিংবা মিডি স্কার্টের সাথে আধুনিক ভঙ্গিতে পরার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। শুলৎসের মতে, এই মৌসুমে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আইটেম হলো সরু গড়নের অ্যাঙ্কল বুট। সামান্য পয়েন্টেড টো থাকলে এটি আরও ট্রেন্ডি হয়ে উঠতে পারে। এই জুতার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর বহুমুখী ব্যবহার। গোড়ালি পর্যন্ত উচ্চতার কারণে প্রায় যেকোনো পোশাকের সাথে এটি মানিয়ে যায়—স্কার্ট বা ড্রেস হোক, কিংবা মিডি বা ম্যাক্সি দৈর্ঘ্যের পোশাক, এমনকি সিকুইন বা লেসের কাজ করা পোশাকের সাথেও দারুণ মানানসই। তবে অ্যাঙ্কল বুটকে শুধু আনুষ্ঠানিক পোশাকের জুতাই ভাবা ঠিক হবে না। বিপরীতধর্মী স্টাইলিংয়েও এর সৌন্দর্য প্রকাশ পেতে পারে। যেমন, বর্তমানে প্রচলিত স্ট্রেইট-কাট বা সামান্য ফ্লেয়ারড-হেম জিনসের সাথে একটি সূক্ষ্ম অ্যাঙ্কল বুট তৈরি করতে পারে চমৎকার কনট্রাস্ট। আর চাইলে মোজাকেও লুকের অংশ বানানো যেতে পারে। বুটের ওপর থেকে মোজার সামান্য অংশ উঁকি দিলেই তৈরি হয়ে যায় আলাদা ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। যারা ট্রেনার পুরোপুরি ছাড়তে চান না, কিন্তু আরও পরিশীলিত কিছু খুঁজছেন, তাদের জন্য উপযুক্ত বিকল্প হতে পারে লোফার। বিশেষ করে ক্রোক-ইফেক্ট লোফার এবার সবার নজর কাড়ছে। শুলৎসের পছন্দের দৈনন্দিন লুকগুলোর একটি হলো ক্রোক-ইফেক্ট লোফারের সাথে ওয়াইড-কাট ব্লেজার, পুসি-বো ব্লাউজ এবং জিনস। কমফোর্ট আর এলিগ্যান্সের নিখুঁত সমন্বয় থাকা এই কম্বিনেশনটি অফিস, শহরের ব্যস্ত দিন কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডায় সহজেই মানিয়ে যায়। শুধু জুতাই নয়, গয়নার জগতেও এবার নরম সুর দেখা যাচ্ছে। স্টাইল কনসালট্যান্ট ডুনিয়া হেসের মতে, বড় স্টেটমেন্ট নেকলেস এবং বিশাল ইয়াররিংয়ের দাপট কমছে। তার বদলে ফিরে আসছে সংযত ও সূক্ষ্ম গয়না। হুপ ইয়াররিং আবারও জায়গা করে নিচ্ছে ফ্যাশনপ্রেমীদের সংগ্রহে। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে ব্রোচের প্রত্যাবর্তন। এবার ব্রোচ শুধু আনুষ্ঠানিক সাজের অংশ নয়, বরং শরৎ-শীতে ব্লেজারের ল্যাপেলে ব্রোচ পরার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। মুখের কাছাকাছি থাকা প্রচলিত গয়নার বদলে এটি হয়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর ও খানিকটা অপ্রত্যাশিত অলংকার। তবে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ব্রোচ পরতে গিয়ে যেন পুরো পোশাকটি অলংকারের ভারে হারিয়ে না যায়। একসাথে অনেক ধরনের গয়না বা পরস্পরের সাথে সংঘর্ষ তৈরি করে এমন কম্বিনেশন এড়িয়ে চলাই ভালো। বরং মুক্তা ও রত্নখচিত ব্রোচ বেছে নিতে পারেন। পোশাকের রঙের সাথে সামান্য মিল থাকলে এসব ব্রোচ আলো প্রতিফলিত করে পুরো লুকটিকেই আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। নতুন মৌসুমের ফ্যাশন মন্ত্রের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়—ফ্যাশন এবার একটু ধীর, একটু নরম, একটু বেশি পরিশীলিত হতে চাইছে। ট্রেনারের জায়গায় সরু অ্যাঙ্কল বুট, চাঙ্কি জুতার বদলে লোফার, বড়সড় স্টেটমেন্ট জুয়েলারির বদলে হুপ বা ব্রোচ—সব মিলিয়ে নতুন মৌসুমে চোখে পড়ার মতো সাজের চেয়ে সূক্ষ্মতায় নজর কাড়ার প্রবণতাই যেন বেশি। সূক্ষ্মতাই এবারের ফ্যাশনের মূল স্টেটমেন্ট। ফ্যাশন এবার উচ্চকিত নয়, বরং আভাসেই জানিয়ে দেবে নিজের উপস্থিতি।