দেশে স্বাধীনতার পর থেকে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে মোট ২৫ জন বিচারপতি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে দুইজন পরে রাষ্ট্রপতি এবং আরও দুইজন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এছাড়া নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই পদত্যাগ করেছেন বা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন এমন প্রধান বিচারপতিও রয়েছেন অন্তত দুজন।
এখন পর্যন্ত জীবিত আছেন ১১ জন সাবেক প্রধান বিচারপতি, যাঁদের মধ্যে ১০ জন দেশে এবং একজন কানাডায় অবস্থান করছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন বাকি ১৪ জন। আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অবসর-পরবর্তী জীবন সবার জন্য একই রকম নয় — কেউ বই পড়া ও লেখালেখিতে মন দিয়েছেন, কেউ সালিসি কাজে যুক্ত, আবার কেউ কেউ সম্পূর্ণ নীরবে দিন কাটাচ্ছেন। এমনও হয়েছেন যিনি অবসরের পর মামলায় জড়িয়ে কারাভোগ করেছেন।
বর্তমানে দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর তিনি শপথ নেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৬১ সালের ১৮ মে, ফলে ২০২৮ সালের ১৭ মে তাঁর ৬৭ বছর পূর্ণ হবে। এর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় গত ২৭ ডিসেম্বর তিনি অবসরে যান। অবসর জীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, পড়াশোনা ও লেখালেখির মধ্যেই সময় কাটছে; আইনাঙ্গনের বাইরের অনেক বই জমে ছিল, এখন সেগুলো মন দিয়ে পড়ছেন।
দেশের ২৪তম প্রধান বিচারপতি ছিলেন ওবায়দুল হাসান, যিনি ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর শপথ নেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কের ফেসবুক পোস্ট ও ফুল কোর্ট সভা নিয়ে বিতর্কের জেরে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করেন। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর পাঁচ মাস আগেই তাকে চলে যেতে হয়। ২৩তম প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর শপথ নিয়ে ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর অবসরে যান। তিনি জানান, রায় লেখার কৌশল নিয়ে পড়াশোনা ও লেখালেখি করছেন।
২২তম প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জানান, কয়েকটি সালিসি মামলা পরিচালনার ব্যস্ততা রয়েছে তাঁর। ২১তম প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ছিলেন দেশের প্রথম অমুসলিম প্রধান বিচারপতি। মেয়াদ শেষের ৮২ দিন আগে তিনি বিদেশ থেকে পদত্যাগ করেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে বিতর্কের পর ছুটি বাড়িয়ে বিদেশে চলে যান তিনি। বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে থাকা এই সাবেক প্রধান বিচারপতি দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, ট্রাভেল ডকুমেন্ট না পাওয়ায় ফিরতে পারছেন না; পাসপোর্টের আবেদন আড়াই বছর ধরে ঝুলে আছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন বলেও তিনি জানান। দুর্নীতি মামলায় ২০২১ সালে তাঁর ৭ ও ৪ বছরের কারাদণ্ড হয়।
২০তম প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন ২০১১ সালের ১৮ মে থেকে ২০১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯তম প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শপথ নেন এবং ২০১১ সালের ১৭ মে অবসরে যান। তাঁর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে রায় দেয়। ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যুবদল কর্মী হত্যা মামলাসহ মোট ৯টি মামলায় আসামি করা হয়। এক বছরের বেশি কারাভোগের পর ১৯ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান তিনি।
১৭তম প্রধান বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলাম মাত্র ৪৭ দিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জানান, বনানীর বাসায় আছেন, শারীরিক কিছু সমস্যা থাকলেও বয়সের তুলনায় ভালো আছেন এবং সালিসি কাজ করছেন। ১৪তম প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় ভালো আছেন বলে জানান এবং ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের কথা উল্লেখ করেন। ১৩তম প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান পা ভাঙার পর থেকে কিছুটা সমস্যায় আছেন এবং বই পড়ে সময় কাটান। ৮ম প্রধান বিচারপতি এ টি এম আফজাল জানান, মানসিক ও শারীরিকভাবে ভালো নেই তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক ২৫ জন প্রধান বিচারপতির মধ্যে ১৪ জন প্রয়াত। প্রথম থেকে সপ্তম প্রধান বিচারপতি — আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেন, কামাল উদ্দিন হোসেন, এফ কে এম মুনিম, বদরুল হায়দার চৌধুরী, সাহাবুদ্দীন আহমদ ও এম এইচ রহমান — সবাই মারা গেছেন। নবম থেকে দ্বাদশ — মোস্তাফা কামাল, লতিফুর রহমান, মাহমুদূল আমীন চৌধুরী ও মাইনুর রেজা চৌধুরীও প্রয়াত। এছাড়া ১৫তম মো. রুহুল আমিন, ১৬তম এম এম রুহুল আমিন ও ১৮তম মোহাম্মদ ফজলুল করিমও মৃত্যুবরণ করেছেন।
১৯৭৫ সালের নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সময় প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম দেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে পদত্যাগ করেন। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন এবং পরে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। সপ্তম প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। দশম প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানও ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।




