সন্তানদের মানসিক জগত বোঝা এবং তাদের সাথে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জোবায়ের মিয়া। প্রথম আলো ট্রাস্টের আয়োজনে কারওয়ান বাজার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ১৮০তম মাদকবিরোধী অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভায় তিনি এই বিষয়ে দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন।
বয়ঃসন্ধিকালে শিশুদের মানসিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে ডা. জোবায়ের বলেন, এই সময়ে সন্তানদের মধ্যে নিজস্ব ব্যক্তিত্ব এবং সত্তার বিকাশ ঘটে। তারা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশের স্বাধীনতা চায়। তবে অনেক অভিভাবক অতি স্নেহের বশে কিংবা তাদের ছোট মনে করে এই মতামতকে গুরুত্ব দেন না। এর ফলে সন্তানদের মনে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং জন্ম নেয় তথাকথিত 'জেনারেশন গ্যাপ' বা মানসিক দূরত্ব।
প্যারেন্টিং বা অভিভাবকত্বকে তিনি মূলত চারটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি হলো 'কর্তৃত্ববাদী' পদ্ধতি, যেখানে নিয়মের পাশাপাশি সন্তানের মতামতের সুযোগ থাকে, যা তাদের আত্মবিশ্বাসী ও সুশৃঙ্খল করে তোলে। দ্বিতীয়টি 'কর্তৃত্বপরায়ণ' পদ্ধতি, যেখানে অভিভাবকরা কঠোর হয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন; এতে সন্তানরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং মানসিকভাবে দূরে সরে যায়। তৃতীয়টি 'অবহেলাপূর্ণ' পদ্ধতি, যেখানে কেবল আর্থিক চাহিদা মেটানো হয় কিন্তু আবেগীয় দিকটি উপেক্ষিত থাকে, যা সন্তানদের হতাশায় নিমজ্জিত করে। সবশেষে 'অতিরিক্ত ছাড়' দেওয়ার প্রবণতা, যার ফলে শিশুদের আচরণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।
অন্তর্মুখী বা ইন্ট্রোভার্ট সন্তানদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, অনেক শিশু সব কথা বলে না। অভিভাবকরা যদি তাদের কথা নিয়ে অন্যদের সামনে উপহাস করেন, তবে তারা আরও গুটিয়ে যায়। এক্ষেত্রে গোয়েন্দাগিরি না করে পরম মমতায় তাদের সাথে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে পড়াশোনায় অমনোযোগী হলে ধৈর্য ধরে কথা বলা প্রয়োজন।
সন্তানদের মানসিক বিকাশে ক্ষতিকর কিছু আচরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্য কারো সাথে তুলনা করা কিংবা অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় ভুল। ছোট ছোট সাফল্যকেও মূল্যায়ন ও পুরস্কৃত করা উচিত। পাশাপাশি ডা. জোবায়ের সতর্ক করেন যে, অভিভাবকরা যদি নিজেরাই ডিভাইসে আসক্ত থাকেন, তবে সন্তানদের ডিভাইস ছাড়ার কথা বললে তারা তা মানবে না।
সন্তান যখন মানসিক সংকটে থাকে, তখন কিছু লক্ষণ স্পষ্ট হয়। যেমন—হঠাৎ ঘরকুনো হয়ে যাওয়া, পড়াশোনার মানের দ্রুত অবনতি, প্রিয় খেলাধুলা বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে অনীহা এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া। এছাড়া স্কুলে বা বাইরে কোনো নির্যাতনের শিকার হলেও আচরণ বদলে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিচারকের ভূমিকা না নিয়ে মিষ্টি সুরে এবং ধৈর্যের সাথে কথা শুরু করার পরামর্শ দেন তিনি। প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট নিবিড় সময় দিলে সন্তান নিরাপদ বোধ করে মনের কথা খুলে বলে।
সবশেষে তিনি জানান, যখন বন্ধুত্বপূর্ণ চেষ্টার পরও দীর্ঘ সময় (৬ মাস থেকে ১ বছর) রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে, আচরণে তীব্র পরিবর্তন আসে কিংবা মাদক ও ডিভাইসে মারাত্মক আসক্তি দেখা দেয়, তখন দেরি না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। সময়মতো কাউন্সেলিং এবং চিকিৎসা শুরু করলে সন্তানকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।




