চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন উড়িরচরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। তীব্র নদী ভাঙনের ফলে স্থানীয় কলোনি বাজার মসজিদের প্রাচীন ও বৃহত্তম কবরস্থানটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে শত শত মানুষ তাদের প্রিয়জনদের শেষ resting place বা কবরের চিহ্ন হারিয়ে চরম শোক ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
৬২ বছর বয়সী জাকির হোসেন এই শোকের এক জীবন্ত উদাহরণ। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর তিনি নিয়মিত তার বাবার কবর জিয়ারত করতেন। তবে গত মঙ্গলবার বিকেলে সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, ২০১২ সালে দাফন করা তার বাবা মো. আলাউদ্দিনের কবরের কোনো চিহ্ন আর অবশিষ্ট নেই; সবকিছু সাগরে মিশে গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাকির হোসেন জানান, এর আগে তিনি তিনবার ভিটেমাটি হারিয়েছেন এবং পুনরায় তা গড়ে তুলেছেন, কিন্তু বাবার কবর পুনরায় তৈরি করার কোনো সুযোগ নেই। তার কাছে এই ক্ষতি বাড়ি হারানোর চেয়েও অনেক বেশি বেদনাদায়ক।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উড়িরচর সন্দ্বীপ উপজেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নোয়াখালী উপকূলের সন্নিকটে অবস্থিত। ১৯৭৫ সালের পর থেকে সন্দ্বীপের বিভিন্ন ইউনিয়নের ভাঙন কবলিত পরিবারগুলো এখানে বসতি গড়ে তোলে। জাকির হোসেনের বাবা ১৯৭৯ সালে কালাপানীয়া ইউনিয়নের তীব্র ভাঙনের মুখে এখানে এসে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদটি এখন আবারও প্রকৃতির রোষানলে।
কেবল জাকির হোসেন নন, আরও অনেক মানুষ তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের কবরের খোঁজে ওই এলাকায় ছুটে এসেছিলেন, কিন্তু তারা শূন্যহস্তে ফিরে গেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা নূর নবি রবিন এই পরিস্থিতির একটি ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করেছেন, যেখানে কবরের চিহ্ন হারিয়ে মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে।
ভয়াবহতা কেবল কবরস্থানেই সীমাবদ্ধ নেই। কলোনি বাজার মসজিদটি এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে, যার ফলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ভক্তদের ইট খুলে নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে অন্য জায়গায় মসজিদ নির্মাণে তা ব্যবহার করা যায়। এছাড়া এলাকার ঐতিহ্যবাহী দ্বীPবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমান মাদ্রাসা এবং উড়িরচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিও খুব দ্রুত বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মিলাদ হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কয়েক দশকের সম্পদ ও স্মৃতি সব ধুয়ে মুছে যাচ্ছে, অথচ তাদের এই আর্তনাদ শোনার কেউ নেই।
এই সংকটময় পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন। তিনি জানান, রাতারাতি মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতির তীব্রতা অত্যন্ত বেশি। বিষয়টি তিনি জেলা প্রশাসককে অবহিত করেছেন এবং অনুরোধ জানিয়েছেন যে, দ্রুত এই ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।




