রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘ হবে, বাংলাদেশে এর প্রভাব তত বেশি মানবিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝুঁকি তৈরি করবে। শুধুমাত্র মানবিক সহায়তা দিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়, বরং রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সম্প্রতি রাজধানীর রমনায় অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) মিলনায়তনে ‘রোহিঙ্গা সংকট: নতুন চ্যালেঞ্জসমূহ এবং টেকসই কৌশল’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এই গুরুত্বপূর্ণ মতামতগুলো উঠে আসে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো–অপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) এই আলোচনার আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান যত বিলম্বিত হবে, সার্বিক জটিলতা তত বাড়বে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দা এবং খোদ রোহিঙ্গারা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি এখন আর কেবল মানবিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সঙ্গে নিরাপত্তার একটি গুরুতর মাত্রা যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নারীদের প্রতি সহিংসতা এবং মাদক চোরাচালানের মতো ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি চরমে পৌঁছেছে। এই কারণে বর্তমান সরকার জাতীয় নিরাপত্তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই ইস্যুটি বিবেচনা করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় কেবল বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কাজ করলে হবে না, বরং নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গেও গভীর সমন্বয় প্রয়োজন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদী জরুরি সহায়তার মডেল থেকে বেরিয়ে এখন প্রত্যাবাসন ও প্রত্যাবর্তনের রূপান্তর কৌশলের দিকে যাওয়া জরুরি। মানবিক সহায়তাকে সমাধানের চূড়ান্ত পথ হিসেবে নয়, বরং প্রত্যাবাসনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি সেতু হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। তিনি অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাকে একীভূত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
আলোচনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সরকার যাচাইপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি মনে করেন, দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার আলোকে এই যাচাই দ্রুত শেষ করতে হবে এবং ২০১৭ সালের পর আসা ব্যক্তি ও শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ পূর্ববর্তী সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি না হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের দপ্তরের স্পষ্ট নীতিনির্ধরণের অভাব নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকারের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এটি বর্তমানে বড় একটি বাধা হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে, ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মাহফুজুর রহমান মনে করেন, মিয়ানমারকে স্পষ্ট সংকেত দিতে হবে যে বাংলাদেশের ধৈর্যের সীমা আছে। তিনি প্রণোদনা, পরিণতি ও প্রেরণা—এই তিনটি বিষয়ের ভিত্তিতে কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন।
একশনএইডের এ দেশীয় পরিচালক ফারাহ কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক হিসেবে না দেখে ভূ-রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ঝুঁকি হিসেবে দেখা উচিত, কারণ এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বাংলাদেশ। আলোচনায় আরও অংশগ্রহণ করেন বিসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কূটনীতিকবৃন্দ। পুরো আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী।




