রাজশাহীর শিরোইল কলোনির নাম শুনলেই এখন বোঝা যায়—এ যেন বক্সিংয়ের এক উর্বর ভূমি। পল্টনের মোহাম্মদ আলী বক্সিং স্টেডিয়ামে চলছে ঘামঝরানো প্রস্তুতি। একদিকে সেলিম হোসেন ও উৎসব আহমেদ, অন্যদিকে মোহাম্মদ বেলাল ও আবু তালহা। গ্লাভসে গ্লাভসে আঘাত, শরীরের চাপ—দেখে মনে হবে যেন কোনো টুর্নামেন্টের লড়াই। আসলে এশিয়ান গেমসের আগে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার শেষ মুহূর্তের মহড়া। ১৯ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় বসবে এশিয়ান গেমসের আসর। সেখানে যাবেন সেলিম ও উৎসব। বেলাল ও তালহা তাঁদের অনুশীলন-অংশীদার হিসেবে সঙ্গে আছেন।
শিরোইলের এই বক্সিং পরম্পরার শুরু প্রায় চার দশক আগে। ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে ৮১ কেজি ওজন শ্রেণিতে ব্রোঞ্জপদক জিতেছিলেন রাজশাহীর মোশাররফ হোসেন। বাংলাদেশের বক্সিং ইতিহাসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে সেটিই একমাত্র পদক। মোশাররফের বাড়ি ছিল তালাইমারীতে, শিরোইলের পাশেই। সেই সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল শিরোইলের প্রতিটি ঘরে। বড়দের মুখে শোনা গল্পই ছোটদের মনে জাগিয়েছিল আত্মবিশ্বাস—তিনি পারলে আমরাও পারব। তারপর থেকেই গলিতে গলিতে বদলে যায় দৃশ্যপট। একজন গ্লাভস হাতে নিলে আরেকজন উৎসাহিত হন। কেউ যায় বিকেএসপিতে, কেউ সার্ভিসেস দলে, কেউ জাতীয় দলে।
বর্তমানে শিরোইলেই ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি ক্লাব ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। দেশের বিভিন্ন সার্ভিসেস দল, বিকেএসপি এবং জাতীয় দলে খেলছেন এখানকার ৩০ জনের বেশি বক্সার। একা বাংলাদেশ আনসার দলেই আছেন শিরোইলের ১০ জন। এই পাড়ারই সন্তান সেলিম। বক্সিংয়ে তাঁর পথটা মসৃণ ছিল না। শুরুতে মা চাইতেন না ছেলে এই খেলায় নামুক—স্রেফ মারামারি ভেবে। কিন্তু তত দিনে সেলিমের বক্সিংয়ের প্রতি ভালোবাসা এত গাঢ় হয়ে গিয়েছিল যে মারধর করেও তাঁকে আটকানো যায়নি। ২০১৫ সালে জাতীয় ক্যাম্পে সুযোগ পান, ২০১৯ সাল থেকে নিয়মিত জাতীয় দলের সদস্য। ২০২২ এশিয়ান গেমসে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত লড়েছিলেন তিনি। সেই হারের হতাশা এবার পদকে রূপান্তর করতে চান—'গতবার অনেক দূর গিয়েও হেরেছি। এবার পদক নিয়েই ফিরতে চাই।'
উৎসবের গল্প অবশ্য ভিন্ন। ছোটবেলায় বক্সিং দেখলে ভয় পেতেন, প্রথম পছন্দ ছিল ফুটবল। ২০১০ সাফ গেমসে তাঁর মামা জুয়েল আহমেদের সোনা জয় পাল্টে দেয় দৃষ্টিভঙ্গি। মামার সাফল্য দেখে মনে হয়, বক্সিংয়েও বড় কিছু করা সম্ভব। ২০১৭ সালে জুনিয়র বক্সিং দিয়ে শুরু। গত বছর এপ্রিলে ভুটানের চার জাতির আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন। এবার প্রথমবার এশিয়ান গেমসে যাচ্ছেন উৎসব। প্রথমবারেই বড় স্বপ্ন—'লক্ষ্য অবশ্যই পদক। জানি সহজ নয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়ব।'
এত প্রতিভা আর সাফল্যের ইতিহাস থাকলেও শিরোইলে আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি একটি স্থায়ী বক্সিং রিং। চারটি দড়ি টানানো অস্থায়ী রিংয়েই ঘাম ঝরান নবাগত থেকে অভিজ্ঞরা। সুযোগ-সুবিধার অভাব সত্ত্বেও থেমে নেই অনুশীলন। তবে সেলিমের আক্ষেপ স্পষ্ট—'আমাদের পাড়া থেকে এত খেলোয়াড় বের হয়, অথচ একটা স্থায়ী রিং পেলাম না।' চাওয়া আর আক্ষেপের মধ্যেই শিরোইলের বক্সিং পরম্পরা প্রমাণ করে, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকলে সব বাধাই জয় করা যায়।




