বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় এবং শেষবারের মতো ইতালি সফর করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক সফরের ১০০ বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে এক লেখকের ভেনিস ভ্রমণের অভিজ্ঞতার আলোকে কবির সেই স্মৃতিগুলো পুনরায় সামনে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট দুবার ইতালি ভ্রমণ করেন, যার প্রথমটি ছিল ১৯২৫ সালে এবং দ্বিতীয়টি ১৯২৬ সালে।

১৯২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি জেনোয়া বন্দরে পৌঁছান কবি। রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্লো ফর্মিকির প্রচেষ্টায় এই সফরের আয়োজন করা হয়েছিল। যদিও ২৫ দিন থাকার কথা ছিল, কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ায় কবি মাত্র ১৫ দিন সেখানে অবস্থান করেন। এই সফরেরই অংশ হিসেবে ২৯ জানুয়ারি ভেনিসে পৌঁছান তিনি। ভেনিসের গ্র্যান্ড হোটেলে অবস্থানকালে কবি সেখানকার জীবন ও শিল্পকলায় মুগ্ধ হন এবং ভেনিসকে 'অ্যাড্রিয়াটিকের রানী' হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি ভেনিসের সাথে বারাণসীর তুলনা করে বলেন, বারাণসীর চরিত্রে যেখানে ধর্মীয় ও দার্শনিক প্রকৃতি, ভেনিসে সেখানে জীবন ও শিল্পের প্রাধান্য। ভেনিস ভ্রমণের পর তিনি বিভিন্ন দ্বীপের কাচশিল্প ও লেসের কাজ পরিদর্শন করেন এবং গন্ডোলায় চড়ে শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। মিলানে থাকাকালীন তিনি ইতালিকে উৎসর্গ করে একটি কবিতা লেখেন, যা পরবর্তীতে 'পূরবী' কাব্যগ্রন্থে স্থান পায়।

তবে ১৯২৬ সালের দ্বিতীয় সফরটি ছিল অধিকতর বিতর্কিত। এবার তিনি সরাসরি বেনিতো মুসোলিনির সরকারি আমন্ত্রণে ইতালিতে যান। ৩০ মে নেপলসে পৌঁছে বিশেষ ট্রেনে রোমে যান এবং মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মুসোলিনির ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিমত্তা দেখে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ 'দ্য নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড'-এ তাঁর প্রশংসা করেন। তবে পরবর্তীতে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী চরিত্র এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়নের কথা জানতে পেরে কবি তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। রোমা রোঁলার মতো বন্ধুদের কাছ থেকে প্রকৃত সত্য জানার পর তিনি এই আদর্শের তীব্র বিরোধী হয়ে ওঠেন।

ইতালি ছাড়ার পর ১৯২৬ সালের ২০ জুলাই ভিয়েনাতে বসে বন্ধু চার্লস অ্যান্ড্রুজের কাছে এক দীর্ঘ চিঠি লেখেন কবি। ৫ আগস্ট 'ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান'-এ প্রকাশিত সেই চিঠিতে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, যে আন্দোলন হিংসার পথ অনুসরণ করে এবং মানুষের বিবেককে দমন করে, তাকে সমর্থন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তিনি ফ্যাসিবাদকে 'নৈতিক আত্মহনন' হিসেবে অভিহিত করেন এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেন। কবির এই সাহসী অবস্থান প্রমাণ করে যে, রাজকীয় আতিথেয়তার চেয়ে মানবতার মূল্য তাঁর কাছে ছিল অনেক বেশি।

বর্তমান সময়ের এক লেখক ভেনিস ভ্রমণের মাধ্যমে এই শতবর্ষ উদযাপন করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে ভেনিস শহরটি যেভাবে ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে রেখেছে, তা অতুলনীয়। যদিও রবীন্দ্রনাথের ইতালি সফর নিয়ে বিচ্ছিন্ন মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া থাকলেও কোনো পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণগদ্য তিনি লিখে যাননি, তবে তাঁর এই সফরগুলো ইউরোপের ভূ-রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদের উত্থান বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।