রংপুর মহানগরের কোতোয়ালি থানায় দায়েরকৃত একটি হত্যা মামলার অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। পুলিশের হাতে আটক হওয়া দুই তরুণ গত রোববার রাতে আদালতের কাছে হত্যার সঙ্গে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-২-এ ১৬৪ ধারার আওতায় এই স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি রেকর্ড করা হয়। বিচারক রফিকুল ইসলামের সামনে বক্তব্য প্রদানের পর আদালত দুজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন নগরের মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস (১৯) ও সিদ্ধার্থ দাস (২৩)। প্রথমজন স্থানীয় সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দ্বিতীয়জন দীর্ঘদিন ধরে—প্রায় আট বছর—স্বর্ণালঙ্কার তৈরির কারিগর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার ভোরে তাদের আটক করা হয়। এরপর রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে তাদের আদালতে হাজির করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত দুজন আদালতের কাছে অপরাধে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। জবানবন্দির বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশে রাজি হননি তিনি। উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করেন, তদন্তের স্বার্থে এখন কিছু বলা সম্ভব নয়। ছাদে ইয়াবা সেবনের দৃশ্য দেখার কারণে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে কি না—এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তদন্ত কর্মকর্তা একই যুক্তি দেখিয়ে নীরবতা অবলম্বন করেন।

অনুসন্ধানের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আগে তদন্ত সম্পন্ন হতে দিন। এরপর সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর জানা যাবে। যেহেতু আসামিরা ইতোমধ্যে স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি প্রদান করেছেন, তাই তাদের রিমান্ডে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ হত্যাকাণ্ডে আরও কোনো ব্যক্তি জড়িত আছে কি না—সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

নিহতদের স্বজনদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে?’ এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও কেউ জড়িত আছে কি না—তা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে তদন্ত কর্মকর্তা স্পষ্ট করেন, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় রিমান্ডের প্রয়োজন নেই।

এদিকে, রোববার দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ হত্যার পেছনের সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, নিহত গণপতি চক্রবর্তী—যিনি রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক—নিজ বাসার ছাদে ওই দুই তরুণকে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলেছিলেন। এই কারণেই শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে একে একে হত্যা করা হয়। কমিশনারের দাবি অনুযায়ী, মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

হত্যাকাণ্ডের পর গত রোববার বিকেলে নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এজাহারে কোনো নির্দিষ্ট আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এই মামলায় আসামির সংখ্যাও নির্দিষ্ট করা হয়নি বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনার পর নিহত চারজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি চারটি চিতায় চারজনের দাহ সম্পন্ন হওয়ার ঘটনায় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। তদন্ত এখনো চলমান এবং পুলিশের পক্ষ থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।