বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি পর্যটন খাত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি দুবাই, টোকিও এবং লন্ডনের মতো শহরগুলো প্রতি বছর কোটি কোটি পর্যটকদের আকর্ষণ করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ মালদ্বীপের অর্থনীতির মূল ভিত্তিই হলো পর্যটন। পর্যটকদের আকর্ষণ করার পেছনে সাধারণত দুটি বিষয় কাজ করে—প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং আধুনিক স্থাপত্যের বৈশ্বিক পরিচিতি। যেমন আইফেল টাওয়ার, বুর্জ খলিফা কিংবা তাজমহলের মতো স্থাপনাগুলো বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়।
প্রকৃতির দিক থেকে বাংলাদেশ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, ইউনেস্কো স্বীকৃত সুন্দরবন, সিলেটের চা-বাগান এবং পার্বত্য জেলাগুলোর সবুজ পাহাড়ের মতো অমূল্য সম্পদ এখানে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই সম্পদগুলোর পরিচিতি অত্যন্ত সীমিত। তথাকথিত বিশ্বরেকর্ডের চেয়ে বাস্তব প্রচার ও প্রসারের অভাবের কারণে বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ এখনো তেমন আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি। পর্যটন খাতের উন্নতি হলে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন খাতের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিপথ বদলে যেতে পারে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে এই খাতের আধুনিকায়ন অপরিহার্য।
পর্যটন শিল্পের এই স্থবিরতার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামোর অভাব। ২০২৬ সালে এসেও পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াত ব্যবস্থার চরম বিশৃঙ্খলা, যানজট এবং ট্রাফিক অরাজকতা লক্ষ্য করা যায়। উন্নত দেশের পর্যটকরা ভ্রমণের সময় শান্ত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ প্রত্যাশা করেন, যা আমাদের সড়ক বা রেলপথে এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব প্রকট। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের মতো আন্তর্জাতিক হাবগুলোতে বিভিন্ন দেশ তাদের পর্যটন স্পটের ডিজিটাল প্রচারণা চালায়, কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। এই উদাসীনতা ও অদক্ষতা বিদেশি পর্যটক না পাওয়ার অন্যতম কারণ।
আতিথেয়তা খাতের সীমাবদ্ধতাও এখানে স্পষ্ট। কক্সবাজারে কিছু স্থানীয় পাঁচতারা হোটেল থাকলেও আন্তর্জাতিক চেইন হোটেলের সংখ্যা খুবই কম। সুন্দরবন বা পার্বত্য জেলাগুলোতে বিশ্বমানের ইকো-রিসোর্টের অভাব রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকা কিংবা পতেঙ্গা ও পারকি সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানের বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব ছিল, যদি সঠিক পরিকল্পনা ও বেসরকারি বিনিয়োগ থাকত।
অনেকে মনে করেন বিদেশি পর্যটকদের আগমনে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংঘাত তৈরি হতে পারে। তবে তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া বা মালদ্বীপের উদাহরণ দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন যে, নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ বজায় রেখেই কোটি কোটি পর্যটককে সেবা দেওয়া সম্ভব। পর্যটন শিল্পের বিকাশে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং তারা বৈশ্বিক মানসিকতার পাশাপাশি ইংরেজি ও বাংলা ভাষার চর্চায় আরও দক্ষ হয়ে উঠবে। বর্তমান সময়ে অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের চাহিদাও বাড়ছে, তাই পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং জোরদার করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে হবে।




