পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমকে (পিসিওএস) এখন থেকে পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়াস সিনড্রোম (পিএমওএস) নামে অভিহিত করার প্রস্তাব উঠেছে। শনিবার রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী সেন্টারে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এই আহ্বান জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। তাঁদের মতে, এই রোগটি কেবল ডিম্বাশয়ের সমস্যা নয়, এর সঙ্গে হরমোন ও বিপাকীয় নানা জটিলতা জড়িত। তাই রোগের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে নাম পরিবর্তন জরুরি।
‘পিসিওএস থেকে পিএমওএস: নাম পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টেরিলিটি সোসাইটি অব বাংলাদেশ (এফএসএসবি)। বৈজ্ঞানিক সহযোগিতায় ছিল এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক রাশিদা বেগম এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মারুফ সিদ্দিকী।
অধ্যাপক রাশিদা বেগম বলেন, পিসিওএস-এর ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের সমস্যাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো, কিন্তু এতে এন্ডোক্রাইন ও মেটাবলিক নানা অসামঞ্জস্য যুক্ত। অ্যান্ড্রোজেন ও ইনসুলিনের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত হয়। চিকিৎসার মাধ্যমে ডিম্বস্ফোটন ঘটিয়ে সন্তানধারণ সম্ভব হলেও মেটাবলিক সমস্যা থেকে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির মাত্রা বৃদ্ধি এবং হৃদরোগের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিতে নতুন নামটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক মারুফ সিদ্দিকী নতুন নামটি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকাশনার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। পাঠ্যবই ও ক্লিনিকাল রিভিউগুলোতে পিসিওএসের বদলে পিএমওএস লেখার আহ্বান জানান তিনি। স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নীতি ও গবেষণায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় তুলে ধরার কথা বলেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে ২০২৮ সালের মধ্যে ১৯৫টি দেশের জন্য একটি গাইডলাইন তৈরি করা সম্ভব হবে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারা বেগম। তিনি নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি একটি প্রেসক্রিপশনে পিএমওএস লেখা দেখে তিনি ভীষণ খুশি হয়েছেন। তাঁর মতে, নতুন নামের ফলে রোগীদের ডিম্বাশয়ের সিস্ট নিয়ে অস্ত্রোপচারের যে উদ্বেগ রয়েছে তা কমে যাবে।
বিশেষ অতিথি ছিলেন ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক সায়েবা আখতার ও অধ্যাপক রওশন আরা বেগম। সায়েবা আখতার বলেন, নামের এই পরিবর্তন মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন আনবে। চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জ্ঞান ও চর্চার মধ্যে সব সময় পার্থক্য থাকে; আজ অর্জিত জ্ঞানকে কাজে দেখাতে হবে, কারণ প্রয়োগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক রওশন আরা বেগম পিসিওএস রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানান। তিনি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের পরামর্শ দেন এবং মুঠোফোন ব্যবহার কমিয়ে নিয়মিত শরীরচর্চার আহ্বান জানান।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশের (এসিইডিবি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ এবং বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি ফারিয়া আফসানা। ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ জানান, প্রতি তিনজন পিএমওএস রোগীর মধ্যে একজনের প্রিডায়াবেটিস রয়েছে। তাঁদের হৃদরোগের ঝুঁকি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি, স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ এবং লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ।
সেমিনারের শেষে কেক কেটে এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের হরমোন ব্র্যান্ডগুলোর উদ্বোধন করা হয়। সংস্থার সেলস বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, এসকেএফের হরমোন পণ্য বিশ্বমানের প্ল্যান্টে উৎপাদিত। তাঁর বিশ্বাস, চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে এই ওষুধগুলো রোগীদের মাতৃত্বের স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে।
সেমিনারের চেয়ারপারসন ছিলেন ওজিএসবির সভাপতি ও এফএসএসবির সহসভাপতি অধ্যাপক ফিরোজা বেগম। স্বাগত বক্তব্য দেন এফএসএসবির সায়েন্টিফিক সেক্রেটারি অধ্যাপক তানজিম সাবিনা চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক ফাহমিদা রশিদ এবং ইসি মেম্বার ফাহমিদা শারমিন।




