ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমাগত সহিংসতার ফলে সৃষ্ট মানসিক আঘাত বা ট্রমা কাটাতে সৃজনশীল শিল্পের আশ্রয় নিচ্ছে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি শিশুরা। হেবরন শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি শিল্পকলা কেন্দ্রে রং আর তুলির আঁচড়ে তারা ফুটিয়ে তুলছে তাদের ভয়, ক্ষোভ এবং মুক্তির স্বপ্ন। ২০২০ সালে চিত্রশিল্পী সারাহ আবু মাদি তার নিজ বসতবাড়িতেই এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘রমমানা’ (আরবিতে যার অর্থ ডালিম)।

বর্তমানে এই কেন্দ্রে প্রায় ৬০০ শিশু ছবি আঁকা শিখছে, তবে সারাহ আবু মাদির লক্ষ্য এই মহলের প্রায় ৩ হাজার শিশুর কাছে শিল্পচর্চা পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ ইহুদি বসতির দ্রুত বিস্তার এবং চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের আক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই কেন্দ্রের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সারাহ আবু মাদি জানান, সামরিক অভিযান বা সহিংসতার পর শিশুদের সাথে কথা বলে তাদের অনুভূতি ও মানসিক প্রভাব বোঝার চেষ্টা করা হয়। তাদের মনে জমে থাকা প্রশ্ন এবং ইচ্ছাগুলো ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করতে উৎসাহিত করা হয়।

এই কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতায় ফুটে ওঠে যুদ্ধের ভয়াবহতা। ১১ বছর বয়সী কারাম সাবাহ জানায়, তার নানার পাহাড়ের জমি ইহুদিরা অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে এবং এখন সেখানে গেলেই গ্রেপ্তার হতে হয়। অন্যদিকে, ১০ বছর বয়সী তালিয়া সাবাহ তার আঁকা খাঁচা ছাড়া পাখির ছবির মাধ্যমে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে। তার মতে, জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো ‘মুক্তি’ এবং ইসরায়েলি সেনাদের চিরতরে চলে যাওয়া, যাতে তারা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শাসনামলে সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপনের হার নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের দৃষ্টিতে এই বসতিগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ। হেবরনের ওয়াদি আল-সামেন মহল্লায় অবস্থিত এই স্টুডিওটি শহর থেকে বেশ দূরে এবং সেখানে পৌঁছাতে অন্তত ছয়টি সামরিক চৌকি বা চেকপয়েন্ট পার হতে হয়।

একটি পুরনো গুদামঘরের কার্পেট বিছানো মেঝে থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন রঙিন ম্যুরালে সজ্জিত দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছেছে। শিশুদের তৈরি এই শিল্পকর্মগুলো এখন শুধু পশ্চিম তীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কানাডায় সফল প্রদর্শনীর পর এখন মেক্সিকোতে প্রদর্শনী আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। শিশুদের আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায়, ডানাওয়ালা ঘোড়ায় চড়ে তিন শিশু সামরিক চৌকির দেয়াল ডিঙিয়ে উড়ে যাচ্ছে। সারাহ আবু মাদির বিশ্বাস, শিল্পচর্চার মাধ্যমে শিশুরা কল্পনা করতে শেখে এবং সেই কল্পনাশক্তির মাধ্যমেই তারা বর্তমানের কঠিন বাস্তবতার বাইরে একটি সুন্দর জগতের স্বপ্ন দেখতে পারে।