তপ্ত রোদের মাঝে শুক্রবার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয় প্রখ্যাত কবি ও শিশু সাহিত্যিক আখতার হুসেনের মরদেহ। সেখানে সমবেত হয়ে তাকে শেষবারের মতো বিদায় জানান শত শত মানুষ। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী এবং জাতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি আন্দোলনের প্রতিনিধিরা মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

স্মরণসভায় প্রয়াতের ছোট ছেলে প্রমিত হুসেন তার বাবার মানবিক দিকটি তুলে ধরেন। তিনি একটি ঘটনার কথা জানান, যেখানে তার বাবা পথে মারধরের শিকার এক কিশোরের জন্য নিজের শার্টটি দিয়ে এসেছিলেন। প্রমিত হুসেন আরও জানান, অসুস্থতাকালীন তার বাবা সহকর্মী শিল্পীদের চরম দারিদ্র্য ও চিকিৎসা সংকটের কথা ভেবে অত্যন্ত ব্যথিত ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন যেন আর কোনো শিল্পী এমন কষ্টে না থাকেন এবং সবার প্রতি আহ্বান জানান শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

প্রয়াত সাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বেইলি রোড থেকে আসা তাসলিমা আকতার বলেন, আখতার হুসেন সাহিত্য, রাজনীতি ও সংগীতের মিশেলে এক অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যার প্রস্থান অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অন্যদিকে, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা রাজিব হাসান তাকে একজন রাজনৈতিক গুরু হিসেবে অভিহিত করেন এবং জানান যে, জীবনের বিভিন্ন দ্বিধা ও সংকটে তিনি আখতার হুসেনের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পেতেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে জাতীয় সংগীত এবং ছাত্র ইউনিয়নের দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর পুলিশি গার্ড অব অনারের মাধ্যমে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানানো হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মরদেহ সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়, যেখানে তার স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন জটিলতায় আখতার হুসেনের মৃত্যু হয়। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখালেখি করেছেন তিনি। তার মৌলিক গ্রন্থ, ছড়া, অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সবচেয়ে বেশি লেখা লিখেছিলেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’ এবং ‘ফ্রিডম ফাইটার’ এর মতো বই।

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়া তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ব্যক্তিত্ব জনপ্রিয় গান ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ এর রচয়িতা ছিলেন এবং দীর্ঘকাল ‘খেলাঘর’ সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন।