পরমাণুর কেন্দ্রে থাকা নিউক্লিয়াসকে ঘিরে নিরবচ্ছিন্নভাবে আবর্তিত হয় ইলেকট্রন। মনে হয় যেন একটি অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা অবস্থায় ঘুরছে সেটি। এই অদৃশ্য বন্ধনের উৎস বৈদ্যুতিক শক্তি। সেই শক্তির উৎস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় আড়াই হাজার বছর আগে। প্রাচীন গ্রিসের মিলেট শহরে বাস করতেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ফালেস। একদিন তাঁর কন্যা অ্যাম্বারের তৈরি চরকায় পশম দিয়ে উল বুনছিলেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ করেন, পশমগুলো বারবার চরকার গায়ে লেপটে যাচ্ছে। কন্যাকে বিশ্বাস না করে ফালেস নিজেই পরীক্ষা করে দেখেন—পশম দিয়ে ঘর্ষণের পর অ্যাম্বার শুধু পশমই নয়, সুতা, চুলসহ বিভিন্ন হালকা বস্তুকেও আকর্ষণ করছে। গ্রিক ভাষায় অ্যাম্বারকে বলে 'ইলেকট্রন'। সেই সূত্র ধরেই পরে ঘর্ষণে সৃষ্ট এই আকর্ষণ শক্তির নাম রাখা হয় ইলেকট্রিসিটি।

একইভাবে, সিল্কের রুমাল দিয়ে কাঁচের দণ্ড ঘষলে সেটিও হালকা বস্তুকে টানতে শুরু করে। কিন্তু দুই টুকরো অ্যাম্বারকে পশম দিয়ে ঘষলে তারা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। কাঁচের দুটি দণ্ডকেও একই রকম দেখা যায়। তবে একটি অ্যাম্বারের টুকরো আর একটি কাঁচের দণ্ড একে অপরকে আকর্ষণ করে। বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, এই দুই ধরনের বিদ্যুৎ ভিন্ন ধর্মের। কাঁচের বিদ্যুৎকে চিহ্নিত করা হয় প্লাস (+) এবং অ্যাম্বারের বিদ্যুৎকে মাইনাস (-) হিসেবে। অ্যাম্বারের বিদ্যুৎ আগে আবিষ্কৃত হলেও সেটিকে মাইনাস নামকরণ করা হয়েছিল, যা পরে বিজ্ঞানীরা মনে করেছেন যথাযথ ছিল না—কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আর পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি।

অনেক পরে প্রমাণিত হয়, প্রকৃতিতে ঋণাত্মক চার্জবিশিষ্ট অতি ক্ষুদ্র কণা রয়েছে, যার নাম দেওয়া হয় ইলেকট্রন। পশম দিয়ে অ্যাম্বার ঘষলে অ্যাম্বারে বিপুল সংখ্যক ইলেকট্রন জমা হয়, ফলে এটি ঋণাত্মক চার্জ পায়। ইলেকট্রনগুলো আসে পশম থেকে, আর ইলেকট্রন হারিয়ে পশম হয়ে ওঠে ধনাত্মক। ধনাত্মক চার্জ পাওয়া কিন্তু খুবই সহজ—শুকনো চুলে প্লাস্টিকের চিরুনি দিয়ে কয়েকবার আঁচড়ালেই চুল থেকে ইলেকট্রন চিরুনিতে স্থানান্তরিত হয়। চিরুনি হয় ঋণাত্মক, আর চুল ধনাত্মক চার্জে চার্জিত হয়। তবে ইলেকট্রনের চার্জের পরিমাণ এতটাই নগণ্য যে এর চেয়ে কম চার্জযুক্ত কোনো কণা আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের চোখে পড়েনি।

ইলেকট্রন আবিষ্কারের পর জানা যায়, প্রতিটি পরমাণুতেই ঋণাত্মক চার্জের এই কণাগুলো বিদ্যমান। তাহলে পরমাণুও কি ঋণাত্মক চার্জ বহন করবে? বাস্তবে কিন্তু তা হয় না। হাইড্রোজেনের পরমাণুতে একটি মাত্র ইলেকট্রন থাকা সত্ত্বেও পরমাণুটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে পদার্থবিদরা অনুমান করেন, হাইড্রোজেন পরমাণুর ভেতরে এমন কিছু ধনাত্মক চার্জ রয়েছে যার পরিমাণ ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জের সমান। সেই ধনাত্মক কণিকাটির নাম দেওয়া হয় প্রোটন। পরমাণুতে যতগুলো ইলেকট্রন থাকে, ততগুলো প্রোটনও থাকে—এ কারণে পরমাণু সামগ্রিকভাবে কোনো চার্জ বহন করে না।

এখন পরিষ্কার, ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রনকে ধনাত্মক চার্জের প্রোটন নিজ দিকে টানে। দুটির চার্জের পরিমাণ সমান বলে প্রোটন একটি মাত্র ইলেকট্রনকে ধরে রাখতে পারে। পরমাণুতে অতিরিক্ত একটি ইলেকট্রন ঢোকানোর চেষ্টা করলে সেটি বেরিয়ে যাবে। তবে নিউক্লিয়াসে আরেকটি প্রোটন যোগ করা গেলে দ্বিতীয় ইলেকট্রনটিও ধরা সম্ভব। এভাবেই প্রকৃতির এই অদৃশ্য বৈদ্যুতিক বন্ধন পরমাণুর গঠনকে স্থিতিশীল রাখে।

এই প্রতিবেদনটি রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন রোসাটম, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, এনআইএইচপি-এএসই রাশিয়া এবং পরমাণু শক্তি তথ্য কেন্দ্র, ঢাকার সহযোগিতায় প্রকাশিত।