অনেকেই পরীক্ষার আগে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করার পর পরদিন তার অধিকাংশ ভুলে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন। সাধারণত আমরা একে স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা বলে মনে করি, তবে বিষয়টি কেবল স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। পড়ার ধরন, তথ্যের পুনরাবৃত্তি এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের মতো বিষয়গুলো পড়া মনে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মস্তিষ্কে নতুন তথ্য গ্রহণ এবং তা দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করার একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে, যা অনুসরণ করলে শেখার মান বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
মানুষ কেন পড়াশোনা ভুলে যায়, তা নিয়ে ১৯ শতকে জার্মান মনোবিজ্ঞানী হারমান এবিংহাউসের গবেষণা থেকে 'ফরগেটিং কার্ভ' বা ভুলে যাওয়ার বক্ররেখার ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর মতে, নতুন কোনো তথ্য শেখার পর শুরুর দিকে তা ভুলে যাওয়ার গতি অত্যন্ত দ্রুত থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে সেই গতি কমতে থাকে। তবে মনে রাখার বিষয়টি নির্ভর করে তথ্যের প্রকৃতি, শেখার গভীরতা এবং পরবর্তীতে তা কতবার মনে করার চেষ্টা করা হয়েছে তার ওপর।
পড়া মনে রাখার একটি বড় বাধা হলো কেবল বই পড়ে যাওয়া। বারবার একই পৃষ্ঠা পড়ার ফলে মনে হতে পারে বিষয়টি আয়ত্ত করা হয়েছে, কিন্তু বই বন্ধ করলে দেখা যায় তথ্যগুলো স্মৃতিতে নেই। এর পরিবর্তে 'অ্যাক্টিভ রিকল' বা সক্রিয়ভাবে মনে করার চেষ্টা করা বেশি কার্যকর। যেমন—কোনো অধ্যায় পড়ার পর বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করা এবং উত্তরটি মস্তিষ্ক থেকে বের করে আনার চেষ্টা করা। এটি কেবল পড়ার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে তথ্য সংরক্ষণ করে।
অন্যদিকে, পরীক্ষার আগের রাতে একসঙ্গে সব পড়ার অভ্যাস বা 'ক্র্যামিং' সাময়িকভাবে কাজে লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যর্থ হয়। এর বদলে 'স্পেসড রিপিটিশন' বা নির্দিষ্ট বিরতিতে পুনরায় পড়ার কৌশল অবলম্বন করা উচিত। কোনো বিষয় আজ পড়ার পর কয়েক দিন পর আবার সেটি অনুশীলন করলে তা দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে জমা হয়। এছাড়া 'ফাইনম্যান টেকনিক' বা অন্য কাউকে সহজ ভাষায় বিষয়টি বুঝিয়ে বলা একটি দারুণ পদ্ধতি। যদি কাউকে বোঝাতে গিয়ে কোনো জায়গায় আটকে যান, তবে বুঝতে হবে সেই অংশটি আপনার পরিষ্কার নয় এবং পুনরায় পড়ার প্রয়োজন আছে।
তথ্যের সাথে ছবি, মানচিত্র, ছক বা নিজস্ব উদাহরণের সংযোগ স্থাপন করলে তা মনে রাখা সহজ হয়। বিশেষ করে কঠিন শব্দ বা তালিকার ক্ষেত্রে ছোট সূত্র বা শব্দসংক্ষেপ তৈরি করা যেতে পারে। ইতিহাসের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে সাল মুখস্থ করার চেয়ে ঘটনাটিকে একটি গল্পের মতো কল্পনা করলে মস্তিষ্কে তথ্যের সংযোগ আরও দৃঢ় হয়।
সবশেষে, পড়াশোনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘুমের গুরুত্ব অপরিসীম। অনেকে পরীক্ষার চাপে রাত জাগেন, কিন্তু ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সারাদিনের শেখা তথ্যের প্রক্রিয়াকরণ এবং সংরক্ষণ করে। ঘুমের অভাব মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং স্মৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই কিশোরদের জন্য রাতে ৮-১০ ঘণ্টা গভীর ঘুম অত্যন্ত জরুরি। ভালো ঘুমের জন্য ঘুমানোর আগে ফোন দূরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে পরদিন পুনরায় মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব হয়।



