ওয়াশিংটনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের রাষ্ট্রীয় সফরটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে। বুধবার একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পর বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে গার্ড অব অনারের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শি জিনপিংয়ের জন্য ট্রাম্পের এই আয়োজন ছিল আক্ষরিক ও রূপক—উভয় অর্থেই এক রাজকীয় 'লালগালিচা' অভ্যর্থনা, যার অংশ ছিল সামরিক ব্যান্ডের পরিবেশনা এবং যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন। তবে এই বাহ্যিক জৌলুসের আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি অত্যন্ত সামান্য।

দুই রাষ্ট্রপ্রধানের প্রকাশ্য আলাপচারিতায় কূটনৈতিক শিষ্টতা ও উষ্ণতা লক্ষ্য করা গেলেও ভেতরে ভিন্ন চিত্র। বৃহস্পতিবারের বৈঠকের আগে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রকে পান্ডা উপহার দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বিনিময় কর্মসূচির কথা জানান। তিনি দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব বৃদ্ধি এবং একটি উন্নত বিশ্ব গড়তে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার বিষয় হিসেবে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা 'সুপারইন্টেলিজেন্স' সংক্রান্ত জরুরি বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, এসব বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনৈতিক বিশ্লেষক জেনিফার ওয়েলচের মতে, এই আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের পেছনে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ছিল সম্মেলনের একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা এবং নিজেকে দুই দেশের সম্পর্কের 'ভারসাম্য রক্ষাকারী' হিসেবে উপস্থাপন করা। তবে শি জিনপিং তার বক্তব্যে 'থুসিডিডিস ট্র্যাপ' তত্ত্বের কথা উল্লেখ করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, যেখানে বলা হয় যে উদীয়মান ও অবনতিশীল শক্তির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় কোনো সমঝোতা এখনো দূর বলে মনে করা হচ্ছে। মে মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি কম। তবে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান এক বছর মেয়াদি বাণিজ্য 'যুদ্ধবিরতি'র মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো হবে। আর্থিক বিশ্লেষকদের ধারণা, গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধ পুনরায় শুরু করার ঝুঁকি এড়াতে এই মেয়াদ আরও দীর্ঘ হতে পারে।

তবে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণের মতো জটিল বিষয়ে অগ্রগতির সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিশেষ করে এআই নিয়ে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বিপরীত। কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক রবিন ক্লিংলার-ভিডা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এআই-এর অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত এবং এর গতি কিছুটা কমিয়ে আনতে চায়, চীন সেখানে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চায়।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে চীনের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনা এবং বিরল মৃত্তিকা খনিজ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা। পাশাপাশি তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বেইজিং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীননীতির কৌশলবিদ মাইলস ইউ-এর মতে, চীন সাধারণত বিমূর্ত বা তাত্ত্বিক আলোচনা পছন্দ করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান চায়—আর এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ফলপ্রসূ আলোচনা কঠিন হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে, শক্তি প্রদর্শন এবং স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়াই হয়তো এই সফরের প্রধান প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়াবে। শুক্রবার বিকেলে শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে দুই নেতার শেষবারের মতো কথা বলার সুযোগ রয়েছে।