টেক্সাস-ভিত্তিক খ্যাতিমান পরিচালক জেসন হেহির, যিনি ইতিপূর্বে 'দ্য লাস্ট ড্যান্স' চলচ্চিত্রের জন্য পরিচিত, নোভাক জোকোভিচের অসাধারণ ক্যারিয়ার এবং দীর্ঘায়ু নিয়ে একটি নতুন ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেছেন। 'দ্য উলফ ইন উইন্টার' শিরোনামের এই চলচ্চিত্রটি সম্প্রতি প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পেয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী এই টেনিস কিংবদন্তি, যার ঝুলিতে রেকর্ড ২৪টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম একক শিরোপা রয়েছে, তিনি কীভাবে তার চেয়ে অনেক কমবয়সী প্রতিপক্ষের সামনে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখছেন, তা-ই এই ছবির মূল উপজীব্য। পরিচালক হেহির জানিয়েছেন, এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ জীবনী নয়, বরং জোকোভিচের জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিফলন, যেখানে তার সহনশীলতা এবং লড়াকু মানসিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ছবির শিরোনামে ব্যবহৃত 'উলফ' বা নেকড়ে শব্দটির মাধ্যমে তার সাহস, চতুরতা এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা একইসাথে সার্বিয়ার জাতীয় পশুর প্রতীক।

২০০৩ সালে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করা জোকোভিচ এখন তার ক্যারিয়ারের 'শীতকাল' বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছেন বলে মনে করা হয়। সাধারণত এই সময়ে খেলোয়াড়দের দক্ষতা হ্রাস পায় এবং অবসরের কথা চিন্তা করতে হয়। তবে জোকোভিচ এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। নিউ ইয়র্ক সিটিতে জুলাই মাসে ছবির একটি প্রিভিউ প্রদর্শনের সময় তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, তিনি এখনও অবসর নিতে প্রস্তুত নন এবং নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে চান। বর্তমান বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে তিনি পঞ্চম স্থানে রয়েছেন। ২০২৬ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে কার্লোস আলকারাজ এবং উইম্বলডনের সেমিফাইনালে জ্যানিক সিনারের কাছে হেরে গেলেও তার পারফরম্যান্স এখনও উচ্চ水 পর্যায়ে রয়েছে।

আগামী ৩০ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ ইউএস ওপেনে জোকোভিচ চতুর্থ হিসেবে seeded। তার সামনে রয়েছেন আলেকজান্ডার জভেরেভ, কার্লোস আলকারাজ এবং ফেলিক্স অগার-আলিয়াসিমের মতো তরুণ তুর্কিরা। শীর্ষ ১০ জনের তালিকায় তিনি এবং ৩০ বছর বয়সী দানিল মেদভেদেভ ছাড়া বাকি সবাই জেন-জি প্রজন্মের। এই অবস্থান তাকে সেমিফাইনালের আগে শীর্ষ সিড করা খেলোয়াড়দের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দেবে, যা তার পঞ্চম ইউএস ওপেন শিরোপা জয়ের পথ সহজ করতে পারে। পরিচালক হেহিরের মতে, জোকোভিচ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন যেখানে তার অর্জনের বাকি কিছু নেই, তবুও তাকে যা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তা হলো নিজেকে ভুল প্রমাণ করা এবং প্রতিপক্ষের সন্দেহকে জয় করা।

ডকুমেন্টারিতে জোকোভিচের অত্যন্ত কঠোর জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসের কথা বলা হয়েছে। তার নিজস্ব শেফ থাকেন যিনি সবসময় স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করেন। এমনকি প্রচণ্ড গরমেও তিনি সাধারণ পানীয়র বদলে হালকা কুসুম গরম সেলেরি জুসের মতো পানীয় পান করেন, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। হেহির লক্ষ্য করেছেন যে, জোকোভিচের দৈনন্দিন জীবন অত্যন্ত একঘেয়ে—সকালবেলা ধ্যান, স্বাস্থ্যকর খাবার, দীর্ঘ অনুশীলন এবং বিশ্রাম। তবে এই শৃঙ্খলাই তাকে শীর্ষে রেখেছে।

ছবিটিতে জোকোভিচের শৈশবের করুণ গল্পের কিছু অংশও দেখানো হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বেলগ্রেডে বেড়ে ওঠা জোকোভিচের জন্য টেনিস ছিল পরিবারের জন্য মুক্তির পথ। এই কঠিন অতীত তাকে মানসিকভাবে দৃঢ় করেছে এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এক ধরণের 'মনোম্যানিয়াকাল ফোকাস' বা একক লক্ষ্য অর্জনের ক্ষমতা দিয়েছে। সার্বীয় ভাষায় একে বলা হয় 'ইনাট' (inat)—অর্থাৎ যখন সবাই আপনার বিপক্ষে থাকে, তখন সেই জেদ থেকে নিজেকে প্রমাণ করা।

পরিচালক জেসন হেহির জোকোভিচের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তার 'বর্তমানের সাথে বেঁচে থাকার ক্ষমতা'কে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, একজন এলিট অ্যাথলেট হিসেবে জোকোভিচ অতীতের ভুল বা ভবিষ্যতের ভয় নিয়ে মাথা ঘামান না। ম্যাচের চূড়ান্ত মুহূর্তেও তিনি কেবল পরবর্তী পয়েন্টটি জেতার দিকে মনোযোগ দেন। যদিও তার ক্যারিয়ারের সূর্য অস্ত যাওয়ার কথা, কিন্তু তার অদম্য মানসিকতা এবং নিয়মানুবর্তিতা তাকে এখনও টেনিস বিশ্বের এক 'লোন উলফ' বা নিঃসঙ্গ নেকড়ে হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।