একটি পরমাণুর কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রনের অবস্থান এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় ওই পদার্থের গুণাগুণ। উদাহরণস্বরূপ, হিলিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসে দুটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন থাকে, যা একে অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় করে তোলে। অন্যদিকে, হাইড্রোজেন পরমাণু অনেক বেশি সামাজিক এবং সহজেই অন্যান্য পরমাণুর সাথে যুক্ত হতে পারে। প্রোটন ও নিউট্রনের ভরের মধ্যে তেমন পার্থক্য না থাকলেও, প্রোটন ধনাত্মক চার্জযুক্ত এবং নিউট্রন চার্জ নিরপেক্ষ। ফলে নিউক্লিয়াসে নিউট্রনের সংখ্যা পরিবর্তন হলেও ইলেকট্রিক চার্জের কোনো পরিবর্তন হয় না, তবে প্রোটন যোগ করার সাথে সাথে পরমাণুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও চার্জ পরিবর্তিত হয়ে যায়।
পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, একই ধরনের ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটনগুলো একে অপরকে বিকর্ষণ করা সত্ত্বেও কীভাবে একটি ছোট নিউক্লিয়াসে একত্রে অবস্থান করে? সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এই বিকর্ষণের ফলে নিউক্লিয়াস ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে একটি শক্তিশালী আকর্ষণীয় শক্তি প্রোটনগুলোকে একত্রে ধরে রাখে, যাকে বিজ্ঞানীরা 'নিউক্লীয় বল' হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই শক্তির কারণেই পরমাণুর কেন্দ্র স্থিতিশীল ও শক্ত গাঁথুনিতে আবদ্ধ থাকে। পরমাণুর জটিলতা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা ভারী মৌলের কথা চিন্তা করি। যেমন কার্বনের নিউক্লিয়াসে ছয়টি প্রোটন ও নিউট্রন থাকে, লোহার ক্ষেত্রে প্রোটন ২৬টি ও নিউট্রন ৩০টি, আর সোনার নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা ৯৭টি এবং নিউট্রনের ১১৮টি।
পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম পরমাণুর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরেনিয়ামের অধিকাংশ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ৯২টি প্রোটন ও ১৪৬টি নিউট্রন থাকলেও কিছু পরমাণুর নিউট্রন সংখ্যা থাকে ১৪৩টি। প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন এমন পরমাণুগুলোকে 'আইসোটোপ' বলা হয়, যেমন ইউরেনিয়াম-২৩৮ ও ইউরেনিয়াম-২৩৫। পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহৃত হয় কারণ এর একটি বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। এই পরমাণুটি সময়ের সাথে সাথে স্বতস্ফূর্তভাবে ভেঙে দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায় এবং সেখান থেকে প্রচণ্ড গতিতে দুই বা তিনটি নিউট্রন নির্গত হয়।
যখন এই দ্রুতগামী নিউট্রনগুলো অন্য কোনো ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াসে আঘাত করে, তখন সেই নিউক্লিয়াসটিও ভেঙে যায় এবং আরও নতুন নিউট্রন মুক্ত হয়। এভাবে একটি পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া শুরু হয় যাকে 'চেইন রিঅ্যাকশন' বলা হয়। মুক্ত নিউট্রনের সংখ্যা যত বাড়ে, ভেঙে যাওয়া নিউক্লিয়াসের সংখ্যাও তত বৃদ্ধি পায়। এই অবিরাম প্রক্রিয়ার ফলে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়, যা নিয়ন্ত্রিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এবং অনিয়ন্ত্রিত হলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।




