ভারতের নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে 'কর্তৃত্ববাদী' আচরণ এবং অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ তুলে তাঁর অপসারণের দাবি জানিয়েছে বিরোধী দলগুলো। বিরোধীদের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার আদতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নির্দেশে পরিচালিত একজন 'যন্ত্রী' এবং তিনি বিজেপির হাতের পুতুলের মতো কাজ করছেন।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছে ইংরেজি দৈনিক 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন। সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়ার ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাস ধরে অন্য দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির আপত্তি সত্ত্বেও জ্ঞানেশ কুমার একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কমিশনের অভ্যন্তরীণ এই অসন্তোষের বিষয়টি সামনে আসার পর রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, উদ্ধব ঠাকুর ও তেজস্বী যাদবের মতো নেতারা সমস্বরে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। এরই প্রেক্ষিতে গত বুধবার 'ইন্ডিয়া' জোটের এক বৈঠকে দেশব্যাপী আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করা হয় এবং এসআইআর খারিজের দাবি জানানো হয়।

তবে আন্দোলনের এই ডাকের আড়ালে জোটের ভেতরে বড় ধরনের ফাটল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।表面িকভাবে একজোট মনে হলেও, আঞ্চলিক স্বার্থের লড়াই অনেক দলকেই দূরে সরিয়ে রেখেছে। বুধবারের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তামিলনাড়ুর ডিএমকে যোগ দেয়নি, যার মূল কারণ কংগ্রেসের সাথে এম কে স্ট্যালিনের বর্তমান শীতল সম্পর্ক। এছাড়া আম আদমি পার্টি (আপ) বিজেপি বিরোধিতায় সরব থাকলেও কংগ্রেসের সাথে একজোট হয়ে মাঠে নামতে রাজি হয়নি; কারণ পাঞ্জাবে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন কংগ্রেস। উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব প্রতিনিধি পাঠালেও কংগ্রেসের প্রভাব সীমিত রাখার শর্তে এই আন্দোলনের কথা বলছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে রাহুল গান্ধীকে জোটের নেতা মানতে অনিচ্ছুক মমতা এখন তাঁকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, অন্ধ্রপ্রদেশের ওয়াইএসআর কংগ্রেস, ওডিশার বিজু জনতা দল এবং তেলেঙ্গানার বিআরএস-এর মতো দলগুলোকে এখনো এই জোটে টানা সম্ভব হয়নি। এমনকি এনডিএ-র কিছু শরিক দল যেমন চিরাগ পাসোয়ানের দল বা জেডিএস নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতার দাবি জানালেও জোট ত্যাগ করার সাহস দেখায়নি।

আগামী শুক্রবার গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইন্ডিয়া জোট। একই সময়ে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অভিজিৎ দীপকও আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে দলীয় স্বার্থ এবং অন্যদিকে বিজেপির আধিপত্যের ভীতি—এই দুইয়ের দোলাচলে বিরোধী জোটটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই গণআন্দোলনের ফলে নতুন কোনো রাজনৈতিক বিন্যাস তৈরি হয় কি না এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ কার্যকর হয় কি না।