উচ্চ রক্তচাপকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'নীরব ঘাতক' হিসেবে অভিহিত করা হয়, কারণ অনেক ক্ষেত্রে এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন ব্যক্তির একজন এই সমস্যায় আক্রান্ত হলেও অনেকেই তা জানেন না। সাধারণত ১২০/৮০ মিলিমিটার পারদকে আদর্শ রক্তচাপ ধরা হয়, তবে হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যা থাকলে এটি ১২০/৭৫ থাকা শ্রেয়। যদি টানা কয়েকদিন রক্তচাপ ১৪০/৯০-এর বেশি থাকে, তবে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলা হয়। বিশেষ করে ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের প্রতি ৩ থেকে ৬ মাস অন্তর রক্তচাপ পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

উচ্চ রক্তচাপের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে বাকি ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কিডনির সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন এবং স্টেরয়েড বা জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির সেবনের ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।

রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। হৃদপিণ্ডকে অতিরিক্ত চাপে পাম্প করতে হলে তার দেয়াল পুরু হয়ে যায়, যা করোনারি ব্লকেজ এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। একইভাবে, মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্তক্ষরণ বা ব্লক হয়ে স্ট্রোক হতে পারে, যা মৃত্যু কিংবা পঙ্গুত্বের কারণ হয়। এছাড়া কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পেয়ে ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়তে পারে। রেটিনার রক্তনালির পরিবর্তনের ফলে দৃষ্টিশক্তি হারানো বা অন্ধত্ব এবং প্রান্তিক রক্তনালি সংকুচিত হয়ে পায়ে গ্যাংগ্রিনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এমনকি বুক ও পেটের মহাধমনি প্রসারিত হয়ে ফেটে গেলে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে।

এই ঝুঁকি মোকাবিলায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জরুরি। প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, অ্যালবুমিন, রক্তের ক্রিয়েটিনিন, শর্করা এবং চর্বি পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায়। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে লবণ ও চর্বিযুক্ত লাল মাংস বর্জন করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা সাঁতারের মতো ব্যায়াম, ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধূমপান পরিহার এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ উচ্চ রক্তচাপ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না এবং সপ্তাহে অন্তত একদিন রক্তচাপ মেপে তা লিখে রাখা উচিত।