কেউ আপনাকে হঠাৎ সুড়সুড়ি দিলে আপনি চমকে ওঠেন, হাসিতে ফেটে পড়েন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের হাত দিয়ে নিজেকেই যখন সুড়সুড়ি দেন, তখন কেন সেই একই প্রতিক্রিয়া হয় না? প্রশ্নটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের এক জটিল কার্যপ্রণালি। স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের নিউরোমেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. রমা বিশ্বাসের বরাতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন সাংবাদিক রাফিয়া আলম।
অন্যের দেওয়া সুড়সুড়ির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আপনি জানেন না ঠিক কোন মুহূর্তে, শরীরের কোন জায়গায়, কতটা জোরে বা কত দ্রুত গতিতে সেই স্পর্শ আসবে। এমনকি সুড়সুড়ি দেওয়ার আগে আপনি তা দেখতে পেলেও, স্পর্শের তীব্রতা ও গতি সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণাই থাকে না। এই অজানা চমকই মস্তিষ্ককে সজাগ করে তোলে, ফলে চমকে ওঠা, হাসি, শিহরণ কিংবা অস্বস্তি—যেকোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আঙুলের সরাসরি স্পর্শ আর পালকের মতো নরম বস্তুর স্পর্শেও প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য হয়।
কিন্তু যখন আপনি নিজেকে সুড়সুড়ি দেন, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনি আগেই জানেন শরীরের কোন অংশে হাত রাখবেন, কতটা চাপ প্রয়োগ করবেন, আর কী গতিতে আঙুল চালাবেন। মস্তিষ্কের কাছে এই সব তথ্য আগে থেকেই স্পষ্ট। ফলে সুড়সুড়ির সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছালেও, এটি নিজেই সেই সংকেতের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। কারণ, মস্তিষ্ক জানে এটি আপনার নিজের ‘সাজানো’ পরিকল্পনা—কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাই নেই। এই কারণে চমক, শিহরণ, হাসি বা বিরক্তি—কোনো প্রতিক্রিয়াই তৈরি হয় না।
তবে এই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রমও আছে। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি স্বাভাবিক থাকে না, ফলে তারা নিজেকে সুড়সুড়ি দিয়েও হাসতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রোগীদের মস্তিষ্ক নিজের স্পর্শের পূর্বাভাস সঠিকভাবে তৈরি করতে পারে না, তাই সুড়সুড়ির সংকেতকে তারা ‘অচেনা’ হিসেবে গ্রহণ করে। এমনকি নিজের পরিকল্পনা আর তার প্রয়োগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেও এমনটা ঘটতে পারে। এই কারণেই কিছু সিজোফ্রেনিয়া রোগী নিজের হাতের স্পর্শে নিজেই হেসে ওঠেন—যা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব।
সব মিলিয়ে, নিজেকে সুড়সুড়ি দেওয়ার ঘটনাটি মস্তিষ্কের এক ধরনের ‘প্রেডিকশন’ মেকানিজমের ফল। অজানা বা অপ্রত্যাশিত কিছুই যখন থাকে না, তখন মস্তিষ্ক স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। তাই পরের বার নিজেকে সুড়সুড়ি দিয়ে হাসি পেতে চাইলে, মনে রাখবেন—আপনার মস্তিষ্ক আপনার সব পরিকল্পনা আগেই জেনে গেছে।




