পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে আটকে পড়া এক ব্যক্তিকে হাতি উদ্ধার করছে—এমন একটি ২০ সেকেন্ডের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ওই ব্যক্তি যেকোনো মুহূর্তে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, এমন সময় একটি হাতি স্রোতের মধ্যে গিয়ে তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে আনে। ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হচ্ছে, 'নেপালে বন্যার তীব্র স্রোতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করল বন্য হাতি।' কোথাও কোথাও একে নেপাল-তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সময়কার ঘটনা বলেও প্রচার করা হয়েছে।
তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগের দৃশ্য নয়। ওই দুর্যোগের অন্তত ১৮ দিন আগে, অর্থাৎ ৮ আগস্ট থেকেই একই ভিডিও বিভিন্ন ক্যাপশনে অনলাইনে প্রচারিত হচ্ছে। রিভার্স ইমেজ সার্চে ভারতীয় নিউজ পোর্টাল 'বাংলা হান্ট'-এর ফেসবুক পেজে ৮ আগস্ট থেকে ভিডিওটির একটি সংস্করণ পাওয়া যায়। ওই সময়ের একাধিক পোস্টে একে কোথাও আসামের বন্যার দৃশ্য, আবার কোথাও শুধু হাতির সাহায্যে মানুষ উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'এই সময়'-এর ফেসবুক পেজ এবং বাংলাদেশের 'নাগরিক প্রতিদিন'-এর ইউটিউব চ্যানেলেও ৯ আগস্ট একই ঘটনার আরও দীর্ঘ ভিডিও পাওয়া যায়। 'এই সময়'-এর ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়, 'তুমুল জলস্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষকে উদ্ধার করল হাতি' — তবে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ভিডিওটির সত্যতা তারা যাচাই করেনি। অন্যদিকে 'নাগরিক প্রতিদিন' তাদের চ্যানেলে ভিডিওটি 'বন্যার মাঝে মালিককে বাঁচালো পোষা হাতি' শিরোনামে প্রকাশ করে।
ভিডিওটি কি এআই-নির্মিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে Hive Moderation-এর এআই শনাক্তকরণ টুলে পরীক্ষা করা হলে টুলটি ৭৫ শতাংশ সম্ভাবনা দেখিয়েছে যে ভিডিওটি এআই-নির্মিত। তবে শুধু এই টুলের ফলাফলের ভিত্তিতে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং ভিডিওটির উৎস ও প্রকৃত ঘটনাস্থল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকা এবং এটি নেপালের বন্যার আগে থেকেই প্রচারিত হওয়ার প্রমাণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, নেপালের সাম্প্রতিক বন্যাকে ঘিরে আরও কয়েকটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফেসবুকে ছড়ানো একটি ভিডিওতে পাহাড়ি ঢলের সময় 'ভাগো, ভাগো' বলে চিৎকার করতে শোনা যায়, যাকে নেপালের বন্যার দৃশ্য দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু যাচাইয়ে দেখা গেছে, এটি ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের উত্তরকাশী জেলায় ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা। অন্যদিকে, 'নেপালে ভয়াবহ বন্যা, চোখের পলকে মানুষসহ তলিয়ে গেল পুরো ভবন' — এমন ক্যাপশনে ছড়ানো আরেকটি ভিডিও আসলে চলতি বছরের জুলাইয়ে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে ঘটে যাওয়া দুর্যোগের দৃশ্য। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সঙ্গে ভিডিওটির হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
সুতরাং, হাতি দিয়ে মানুষ উদ্ধারের ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার দৃশ্য নয়। একই ভিডিও ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচারের মাধ্যমে প্রেক্ষাপট বদলে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওটির প্রকৃত স্থান ও সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তবে এটি ২৬ আগস্টের নেপাল দুর্যোগের আগে থেকেই অনলাইনে ছিল বলে নিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে।



