নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ধসের ফলে এক প্রলয়ঙ্কারী আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। বুধবারের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত ৩৮৯ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ। এই ভয়াবহ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৯০০ জন মানুষ, যাদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক বলে জানা গেছে। এছাড়া নেপালের পর্যটন বোর্ডের তথ্যমতে, নিখোঁজদের তালিকায় অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকরাও রয়েছেন। তিব্বত সীমান্তের জিরং শহরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে; সেখানে তিনজনের মৃত্যু এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ নিখোঁজ বলে জানিয়েছে চীনের সংবাদমাধ্যম।

বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয় চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্দে নদীতে হিমবাহ ধসের পর কাদা ও ধ্বংসস্তূপের তীব্র স্রোত বয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এই স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে আঘাত হানে, যার ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, রাস্তাঘাট এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। তিব্বত অঞ্চলের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কাদার এক বিশাল ঢেউ বহুতল ভবনের ওপর আছড়ে পড়ছে এবং গাড়ি ও বাসগুলো খেলনার মতো ভেসে যাচ্ছে। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী এলাকায় বাড়িঘর ও সড়ক কাদায় তলিয়ে গেছে এবং অনেক বহুতল ভবনের নিচতলা পানির নিচে চলে গেছে। বর্তমানে নেপালি সেনাবাহিনী আকাশপথে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে এবং উদ্ধারকারীরা বুকসমান কাদার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের সন্ধান করছেন। রেডক্রসের নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার জানিয়েছেন, বন্যায় বেশ কিছু ব্যস্ত বাজার এবং গ্রাম পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে।

এই দুর্যোগের প্রভাব নেপালের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতেও পড়েছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বন্যা সতর্কবার্তা জারি করেছে প্রশাসন। দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৌসুমি বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিধস নিয়মিত হলেও, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই দুর্যোগের তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি বাড়ছে। উচ্চ পর্বতের বরফ ও পাথরের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হচ্ছে।

এদিকে, নতুন করে আরও বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমোড)-এর জলবায়ু ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করে বলেছেন, চীন-নেপাল সীমান্তের উজানে ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপ আটকে আছে। এই পানি হঠাৎ করে ধেয়ে আসলে ভাটি অঞ্চলে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।