বিশ্বজুড়ে বিয়ের পোশাকের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এই বাজারের আকার দাঁড়াবে ৯২ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। বিলাসবহুল বিয়ের পোশাকের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি সাড়ে ১৩ শতাংশ হারে এই খাতের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত।

এই বৈশ্বিক চাহিদার একটি অংশ পূরণ করছে নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেড। নদীতীরবর্তী ২৯২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই শিল্প অঞ্চলে ২৭৬টি প্লট রয়েছে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এখানে ৮৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে এবং ১১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।

এই ইপিজেডের ইউবিএফ ব্রাইডাল নামের কারখানায় তৈরি হচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার কনেদের সাদা বিয়ের গাউন। স্পেনে নকশা করা এসব পোশাকের দাম ৫০০ থেকে দেড় হাজার ডলার পর্যন্ত। মূলত মধ্যম দরের ক্রেতাদের লক্ষ্য করে এগুলো প্রস্তুত করা হয়। জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ প্রায় ৩৭টি দেশে ‘বাংলাদেশে তৈরি’ লেখা এই গাউন পৌঁছে যায়।

প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালে টঙ্গীতে উৎপাদনকাজ শুরু করেছিল। বিশেষায়িত এই কাজে প্রথমে দক্ষ শ্রমিক পাওয়া কঠিন ছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে আদমজী ইপিজেডে স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে পাঁচতলা ভবনের আটটি উৎপাদন লাইন থেকে বছরে ৫০ লাখ ডলারের বেশি পোশাক বিদেশে পাঠানো হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরে ৮০ থেকে ৯০ লাখ ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কারখানায় শুধু গাউন নয়, সাটিন ও লেসের পোশাক, বিয়ের ঘোমটা (ভেইল), বোলেরো ও গয়নার মতো পশ্চিমা বিয়ের সামগ্রীও তৈরি হয়। প্রায় সাড়ে ৪০০ শ্রমিক এখানে কর্মরত, যাদের অধিকাংশই নারী। প্রতি লাইনে ২৩ জন করে কাজ করেন। কাটিং, মান যাচাই ও প্যাকেজিংয়ের জন্য আলাদা দল রয়েছে। একটি পোশাক সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লাগে।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, শ্রমিকরা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। মিনা আক্তার ও সোনিয়া বেগম লেস বসানোর কাজে নিয়োজিত। পাগলায় ও আনন্দনগরে বসবাসকারী এই দুই নারী মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন পান এবং তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা রত্না বেগম নরসিংদীর বেলাব থেকে আসেন। সাড়ে ১৮ হাজার টাকা বেতনে চার বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। গাড়িচালক স্বামী ও স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার চলছে স্বচ্ছন্দে।

প্রতিষ্ঠানের চিফ অপারেটিং অফিসার মো. রবিউল হক সিদ্দিকী জানান, নতুন ধরনের কাজ হওয়ায় শুরুর দিকে কর্মী সংকট ছিল। পরবর্তীতে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করে নিজেরাই দক্ষ কর্মী গড়ে তোলা হয়। তিনি আরও বলেন, প্রায় ছয় মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে এবং নকশার জন্য কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কারখানার পরিবেশ ভালো বলে জানান কর্মীরা। তাদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় পশ্চিমা নববধূদের চোখধাঁধানো বিশাল গাউন, যা পরেই কনেরা জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন।