সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম নিয়ে একটি মিডিয়া সংলাপ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ সময় উপস্থিত ছিলেন একই পদমর্যাদার ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ও অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতা কাঠামো নির্ধারণে সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অভাব রয়েছে বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর ভাষায়, এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং সময় যত গড়াবে, পরিস্থিতির জটিলতা তত বাড়বে। শুধু বেতন-ভাতার সিদ্ধান্তই নয়, এ ক্ষেত্রে বিলম্ব সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজকেও ব্যাহত করতে পারে বলে তিনি সতর্কতা প্রকাশ করেন।
আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারিত থাকলেও এর বিপরীতে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বেতন কাঠামো বিষয়ে যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের একটি সুপারিশ ছিল এবং তা সকলেই মেনে নিয়েছিল। দেবপ্রিয়ের মতে, শুরুতেই যদি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা প্রদান করে সময় চাওয়া হতো, তাহলে তা অনেক ভালো হতো। কিন্তু বর্তমানে বিষয়টি যে অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটি সন্তোষজনক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে সিপিডির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে স্থায়ীভাবে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে মোট ৬১ হাজার ৮৮১ জন মানুষ তাদের কর্মস্থল হারিয়েছেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু কাঠামোগত অসুবিধা পেয়েছিল। তৎকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূল ছিল না; বরং সংঘাতের সূচনা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক দলিল প্রস্তুত করা হয়নি। ফলে এখন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বারবার বলা হচ্ছে যে খারাপ পরিবেশের মধ্যে দায়িত্ব নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই ‘খারাপ পরিস্থিতি’ কী ছিল, তার কোনো সমন্বিত নথি নেই। এতে সরকারি বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে পরিসংখ্যানের সামঞ্জস্য করাও জটিল হয়ে উঠেছে।
নতুন সরকারের কাছে দুটি প্রধান প্রত্যাশা ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসনের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এ দুই ক্ষেত্রেই কিছুটা অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন দেবপ্রিয়। সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও কোনো সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি। ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা উল্লেখ ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ মূল্যায়নের জন্য সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা তৈরি করেছে। এগুলোকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর আওতায় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নের জন্য রাখা হয়েছে।
ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি সংসদ সদস্যদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডে দ্রুত বিচারের উদ্যোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার প্রচেষ্টাকে। অন্যদিকে, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের ঘটনা উদ্বেগজনক। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সরকারি প্রতিশ্রুতিরও ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।




