বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল এলাকায়। বাঁকখালী নদীর তীরে নির্মিত দেশের বৃহত্তম বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি এখন জাতীয় গ্রিডে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী, পোকখালী এবং পিএমখালী—এই চারটি ইউনিয়নে বিস্তৃত। এখানে মোট ২৩টি বিশাল টারবাইন বা বায়ুকল স্থাপন করা হয়েছে, যার প্রতিটির জন্য ২০ শতক করে জমি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি টারবাইনের খুঁটির উচ্চতা ৯০ মিটার এবং ব্লেডের দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার।

প্রকল্পের সমন্বয়কারী কর্মকর্তা এনামুল হকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ মে থেকে এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হতে শুরু করলেও ২০২৪ সালের ৮ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। গত আড়াই বছরে (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত) এই কেন্দ্রটি প্রায় ২ লাখ ৯৬ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশব্যাপী সরবরাহ করেছে। বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটারের বেশি হলেই এই আধুনিক প্রযুক্তির টারবাইনগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যার রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত রয়েছেন আটজন দক্ষ প্রকৌশলী।

৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের যাবতীয় যন্ত্রপাতি চীন থেকে আনা হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করেছে চীন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউএস-ডিকে গ্রিন এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড ২০২২ সালের ৩১ মার্চ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু করে। এনামুল হক মনে করেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি বা পেট্রোলের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে ঝুঁকানোই এখন একমাত্র বিকল্প।

বায়ুবিদ্যুতের পাশাপাশি কক্সবাজার শহরে সৌরবিদ্যুৎ প্রসারেও উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। শহরের প্রায় ৭০০ বহুতল ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস এবং কিছু সরকারি-বেসরকারি অফিস রয়েছে। পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণি জানান, সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রস্তুতি চলছে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। তবে হোটেলগুলোর ছাদে সুইমিংপুল বা রেস্তোরাঁ থাকায় জায়গা স্বল্পতার কারণে সেখানে সোলার প্যানেল বসানো কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্রের ঢেউ এবং লবণমাঠ থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক আবিদ আহসান সাগর জানান, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কক্সবাজারের উপকূলে দক্ষিণমুখী বাতাসের প্রবাহ বেশ শক্তিশালী। কুতুবদিয়া, মহেশখালী এবং টেকনাফ এলাকায় বায়ুর গতিবেগ স্থিতিশীল হওয়ায় সেখানে প্রকল্প সম্প্রসারণ করলে জাতীয় বিদ্যুৎ সংকট অনেকাংশে দূর করা সম্ভব।

তবে এই সাফল্য সত্ত্বেও পর্যটন শহর কক্সবাজারে লোডশেডিংয়ের সমস্যা রয়ে গেছে। খুরুশকুল প্রকল্প এবং মাতারবাড়ীর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় বাসিন্দারা এবং হোটেল মালিকরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ভোগেন। স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হক ও হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যটকদের চরম দুর্ভোগ হচ্ছে এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে জেনারেটর চালানোও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। পিডিবি-র নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণি জানান, শহরের দৈনিক চাহিদা ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট, তবে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন ২ থেকে ১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হচ্ছে।