বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা পেসার মোস্তাফিজুর রহমান আজ তাঁর ৩১তম জন্মদিনে পা দিলেন। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে এক যুগ ধরে তিনি বাংলাদেশের জার্সিতে নানা সাফল্যের সাক্ষী। জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোই তুলে ধরা হলো এখানে।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম দিনটি ছিল ২০১৫ সালের ২৪ এপ্রিল, প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। সেই ম্যাচে পাকিস্তানের ভয়ংকর ব্যাটসম্যান শাহিদ আফ্রিদিকে আউট করেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রথম সাফল্য পান মোস্তাফিজ। এরপর মোহাম্মদ হাফিজকেও ফিরিয়ে দেন তিনি। ৪ ওভারে ২০ রান দিয়ে ২ উইকেট শিকার করেন, যার মধ্যে ১৬টি ডট বল ছিল। সেই ম্যাচে ১৬ বছর পর পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।

অভিষেকের দুই মাস পর ওয়ানডে অভিষেকেও তিনি আলো ছড়ান। ২০১৫ সালের ১৮ জুন ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে রোহিত শর্মা ও রাহানেকে আউট করে শুরুতেই চমক দেন। তবে মাঝপথে বারবার বল করার পর দাঁড়িয়ে যাওয়ায় রোহিত আম্পায়ারের নজরে আনেন। ভারতের অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি তখন কিছু না বলে তাঁকে ধাক্কা দেন, যার ফলে চিকিৎসার জন্য মাঠ ছাড়তে হয়েছিল মোস্তাফিজকে। পরে ফিরে এসে তিনি রায়না, অশ্বিন ও জাদেজাকে আউট করে অভিষেকেই ৫০ রানে ৫ উইকেট নেন। সেই ম্যাচে ম্যাচসেরা হয়ে বাংলাদেশের জয়ে অবদান রাখেন তিনি।

প্রথম ওয়ানডে সিরিজেই তিনি ১৩ উইকেট নিয়ে সিরিজ সেরা নির্বাচিত হন। ভারতের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট নেওয়ার পর তৃতীয় ম্যাচে নেন আরও ২ উইকেট। ভারতের তারকা ব্যাটসম্যানদের বিপর্যস্ত করে দেওয়ায় মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি।

টেস্ট সংস্করণেও ছিল তাঁর জাদু। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে প্রথম ১৩ ওভারে কোনো উইকেট পাননি। তবে ১৪তম ওভারে এসে যেন খুলে গেল সব। প্রথম বলে হাশিম আমলা, পরের বলে জেপি ডুমিনি—এক ওভারে তিন উইকেট তুলে নেন তিনি, যদিও হ্যাটট্রিক হয়নি। বৃষ্টিতে ম্যাচটি ড্র হলেও ম্যাচসেরার পুরস্কার পান মোস্তাফিজ।

২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২২ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের কাটার জাদু দেখান। উইলিয়ামসনসহ চারজন ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করেন তিনি। সেই আসরে তিন ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে আইপিএলের দরজাও খুলে যায় তাঁর সামনে।

আইপিএলে অভিষেক ম্যাচেই এবি ডি ভিলিয়ার্সের উইকেট তুলে নেন মোস্তাফিজ। শেন ওয়াটসনও ছিলেন তাঁর শিকার। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে ৪ ওভারে ২৬ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন, দলের অন্য বোলাররা যেখানে ওভারপ্রতি ১২-এর বেশি রান দিচ্ছিলেন, সেখানে তাঁর ইকোনমি ছিল ৬.৫০। সেই মৌসুমে কলকাতার আন্দ্রে রাসেলকে ইয়র্কারে বোল্ড করে উইকেটের ওপর ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে গাঁথা।

আইপিএলের সেই মৌসুমে ১৬ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে ২৪.৭৬ গড়ে ও ৬.৯০ ইকোনমিতে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম ভরসা। দলের সাফল্যের টার্নিং পয়েন্টগুলোতে তাঁর অবদান ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে প্রথম বিদেশি ক্রিকেটার হিসেবে ‘সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের’ পুরস্কার পান তিনি, যা আজও ইতিহাসে একমাত্র বিদেশি হিসেবে রয়ে গেছে।

ওয়ানডে বিশ্বকাপে তাঁর অভিষেকও ছিল রঙিন। ২০১৯ বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে ২০ উইকেট নিয়ে ছিলেন চতুর্থ সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫টি করে উইকেট নেন তিনি।

সবশেষে ২০২৪ সালে হিউস্টনে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের কোনো বোলার হিসেবে প্রথম ৬ উইকেট নেন মোস্তাফিজ। ৪ ওভারে মাত্র ১০ রান দিয়ে এই কীর্তি গড়েন তিনি। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিকও এখন তিনিই।