সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটার প্ল্যাটফর্মে বিপুল অর্থ খরচ করে ভুয়া ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাকাউন্ট চালানোর যে নেটওয়ার্ক টেমু গড়ে তুলেছিল, তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফর্চুন ম্যাগাজিনে এই গোপন কার্যক্রমের কথা প্রকাশিত হওয়ার পরপরই টেমু এই পদক্ষেপ নেয়। চেক ভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া গবেষণা সংস্থা 'অনলাইন রিস্ক ল্যাবস' (ORL)-এর তথ্যমতে, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে ইনফ্লুয়েন্সার এবং ক্রিয়েটরদের সাথে পার্টনারশিপ বিজ্ঞাপনে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল টেমু।
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাস সময়কাল জুড়ে টেমুর বিজ্ঞাপনী কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে ORL দেখেছে যে, সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন প্রচার করা ১০০টি ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাকাউন্টের মধ্যে প্রায় ৭৩টিই ছিল ভুয়া। এই অ্যাকাউন্টগুলোর নাম ছিল অদ্ভুত এবং এগুলো মূলত চীন, রাশিয়া, বাংলাদেশ ও ইরানে অবস্থিত ছিল। এছাড়া অনেক অ্যাকাউন্ট ঘনঘন নাম পরিবর্তন করত, যা কৃত্রিম কার্যক্রমের স্পষ্ট লক্ষণ বলে মনে করে গবেষকরা। এই ১০০টি অ্যাকাউন্ট ১.৪ মিলিয়নেরও বেশি পার্টনারশিপ বিজ্ঞাপনে যুক্ত ছিল এবং এর সামগ্রিক রিচ ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন। মেটার পার্টনারশিপ বিজ্ঞাপন প্রোগ্রামে ক্রিয়েটররা ব্র্যান্ডের প্রচার করে কন্টেন্ট তৈরি করেন এবং কোম্পানি সেই কন্টেন্ট বুস্ট করার জন্য অর্থ প্রদান করে, যার একটি অংশ ক্রিয়েটররা পান।
গত ৩১ আগস্ট ফর্চুন ম্যাগাজিনে এই খবরটি প্রকাশিত হওয়ার সময় টেমু প্রতিদিন প্রায় ৪,৯০০টি পৃথক পার্টনারশিপ ক্যাম্পেইন চালাত। তবে সেপ্টেম্বর ৪ তারিখের মধ্যে দেখা যায়, শীর্ষ ১০০টি অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৯০টিতেই টেমুর কোনো বিজ্ঞাপন নেই। এমনকি ৫৪টি অ্যাকাউন্ট ৩১ আগস্টের পরপরই বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য যে, টেমুর মোট ক্রিয়েটর নেটওয়ার্কে ১২,০০০-এর বেশি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার অনেকগুলোই বৈধ।
এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় অ্যাকাউন্ট ছিল 'ইয়া লিলি' (Ya Lilly), যার ইনস্টাগ্রামে ১ লক্ষ ৮৩ হাজার এবং ফেসবুকে ১ লক্ষ ২৯ হাজার অনুসারী ছিল। গবেষণার সময়কালে তার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ২ লক্ষ ৭৮ হাজার বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছিল, যা গড়ে প্রতিদিন ২২৫টি। তবে ৪ সেপ্টেম্বরের পর তার বিজ্ঞাপন প্রায় শূন্যতে নেমে আসে এবং ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সে পুরোপুরি পোস্ট করা বন্ধ করে দেয়।
ORL-এর ম্যানেজার ভেন্ডুলা প্রোকুপকোভা জানান, এই ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলোর বেশিরভাগই রাশিয়ায় অবস্থিত ছিল এবং তারা গত দুই সপ্তাহ ধরে কোনো নতুন পোস্ট বা রিল প্রকাশ করেনি। এছাড়া অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে তাদের অবস্থানের দেশের তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে বৈধ ক্রিয়েটরদের জন্য টেমুর বিজ্ঞাপন বাজেট অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আয়ারল্যান্ড, সাইপ্রাস, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, লাতভিয়া এবং স্লোভেনিয়ায় পার্টনারশিপ বিজ্ঞাপনগুলো প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই দেশগুলোতে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইন থাকায় টেমু এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিছু দেশে এই অপরাধের জন্য জেল এবং আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। এই পুরো বিষয়ে টেমু বা মেটা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।




