ক্রিকেটের রং বদলেছে। এক সময় যাঁরা মাঠে বল হাতে বা ব্যাট হাতে দলের হয়ে লড়তেন, সেই ক্রিকেটারদের অনেকেই এখন মাঠের বাইরে বসে দলের ভবিষ্যৎ ঠিক করছেন। কাকে দলে নেওয়া হবে, দলটি কেমন গঠন হবে, এমনকি ব্যবসায়িক কৌশলও—সবকিছু এখন তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। ক্রিকেটার থেকে দলের মালিক হওয়ার এই প্রবণতা আর ব্যতিক্রমী নয়; বরং টি-টোয়েন্টি ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের প্রসারের সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে নতুন এক বাস্তবতা।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চিত্র দেখা যাচ্ছে ইউরোপে। নতুন ইউরোপিয়ান টি-টোয়েন্টি প্রিমিয়ার লিগে (ইটিপিএল) দলগুলোর মালিকানার তালিকা দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়—মাঠের তারকারাই এখন ফ্র্যাঞ্চাইজির কর্ণধার। ভারতের সাবেক অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড় রয়েছেন ডাবলিন গার্ডিয়ান্সের মালিকানায়। দক্ষিণ আফ্রিকার জন্টি রোডস, ফাফ ডু প্লেসি ও হাইনরিখ ক্লাসেন যৌথভাবে গড়েছেন রটারডাম ডকারস। সেখানে ডু প্লেসি শুধু মালিকই নন, দলের অধিনায়কও। অর্থাৎ যে মানুষটি মাঠে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, মাঠের বাইরেও তিনিই দলের অন্যতম মালিক।

অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েলও একই পথে হেঁটেছেন। বেলফাস্ট উলভসের সহমালিক তিনি, আবার দলের অধিনায়কও। আরেক অস্ট্রেলিয়ান ম্যাথু হেইডেনের দায়িত্ব আরও বিস্তৃত—গ্লাসগো কসমিকের মালিক হওয়ার পাশাপাশি তিনি দলের প্রধান কোচের ভূমিকাও পালন করছেন। নিউজিল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার কাইল মিলস ও নাথান ম্যাককালাম এডিনবরা ক্যাসল রকারসের মালিক। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ আমস্টারডাম ফ্লেমসের মালিকানায় যুক্ত।

এই ইটিপিএল অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের তুলনায় এক বিশেষ কারণে ব্যতিক্রমী। বিপিএল, আইপিএল, পিএসএল বা সিপিএলের মতো লিগগুলো একটি করে ক্রিকেট বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চলে। কিন্তু ইটিপিএলে রয়েছে তিনটি বোর্ডের সংশ্লিষ্টতা—স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস। তবে প্রধান বিনিয়োগকারী ভারতীয় ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপ, যেখানে সামনের সারিতে রয়েছেন বলিউড অভিনেতা অভিষেক বচ্চন। ইউরোপের ছয়টি শহরভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ে চলছে লিগটির প্রথম মৌসুম।

ক্রিকেটারদের দল মালিকানার এই ধারা ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাবেক ভারতীয় ওপেনার শিখর ধাওয়ান যুক্ত হয়েছেন দিল্লি প্রিমিয়ার লিগের সাউথ দিল্লি সুপারস্টারসের মালিকানায়। কেরালা ক্রিকেট লিগে মালিকের ভূমিকায় আছেন সাবেক ভারতীয় পেসার এস শ্রীশান্ত—অ্যারিস কোলাম সেইলরসের সহমালিক তিনি। একই লিগে আছেন ক্যারিবীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি ক্রিস গেইল। কোচি ব্লু টাইগার্সের সহমালিক ও মেন্টর তিনি। একসময় যাঁর ব্যাটিং টি-টোয়েন্টির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল, সেই গেইল এখন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানার অংশ।

জহির খানের পথটা আরও বিস্তৃত। ভারতের সাবেক পেসার ব্যবসায় নাম লিখিয়েছিলেন আগেই, এবার তিনি যুক্ত হয়েছেন দুটি ফ্র্যাঞ্চাইজিতে। লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগের জাফনা কিংসের মালিকানা গ্রুপে স্টকহোমভিত্তিক অ্যাংকর স্পোর্টস এবির সঙ্গে যোগ দিয়েছেন তিনি। সেই অ্যাংকর স্পোর্টস কানাডার সুপার৬০ লিগের দল ভ্যাঙ্কুভার অ্যাংকরসেরও মালিক। ফলে জহির এখন দুটি ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা গোষ্ঠীতে আছেন। ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, ভ্যাঙ্কুভারের মালিকানায় জহিরের সঙ্গে আছেন ভারতের সাবেক তারকা অলরাউন্ডার যুবরাজ সিংও।

এক সময় ক্রিকেটাররা মাঠের ক্যারিয়ার শেষে কোচিং, ধারাভাষ্য অথবা ক্রিকেট প্রশাসনে যেতেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের নতুন দুনিয়ায় তাঁরা এখন দলের মালিক হয়েও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। মালিকানা যেমন দিয়েছে ব্যবসায়িক স্বাধীনতা, তেমনি খেলাটির সঙ্গে যুক্ত থাকার নতুন সুযোগও তৈরি করেছে।