যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবসর নিয়ে হতাশাও যেন প্রকট আকার ধারণ করছে। সম্প্রতি ওয়ালেটহাবের এক জরিপে উঠে এসেছে, ৪৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, তাঁদের পক্ষে আর অবসরে যাওয়া সম্ভব হবে না—মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করে যেতে হবে। জরিপে অংশ নেওয়াদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ জানিয়েছেন, অবসরের চিন্তা করলেই তাঁদের উদ্বেগে ভোগায়; আর ২৯ শতাংশের ধারণা, কাজ বন্ধ করার পর পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে।

অবসর নিয়ে সন্দেহ যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কিছু নয়। ২০০১ সাল থেকে প্রতিবছর গ্যালাপের জরিপে সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন জানিয়ে আসছেন, অবসরের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তাঁদের শঙ্কা রয়েছে। চিকিৎসা ব্যয়সহ অন্যান্য আর্থিক উদ্বেগকে পেছনে ফেলে দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির শীর্ষ আর্থিক দুশ্চিন্তার তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে এই বিষয়টি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতির নতুন ঢেউ আবারও ঘরোয়া বাজেটে চাপ সৃষ্টি করেছে, যা অবসর নিয়ে দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফরচুন ম্যাগাজিন তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছে, অবসরভাতার সংকোচন থেকে শুরু করে সঞ্চয়ের ব্যবধান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে।

জ্বালানি ও খাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে এক গ্যালন নিয়মিত পেট্রলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৪.২৭ ডলারে—গত সাত দিনেই বেড়েছে ১৩ সেন্ট। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য বলছে, জুলাই মাসে এক পাউন্ড গরুর কিমার গড় দাম ৬.৮৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ৯.৪ শতাংশ বেশি। এই দামবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন রিটায়ারমেন্ট সিকিউরিটির (এনআইআরএস) আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ মার্কিন মনে করেন, অবসরে আর্থিক নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবেন না; এদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতিকে দায়ী করেছেন, আর ৬২ শতাংশ বাজারের অস্থিরতাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এমপ্লয়ি বেনিফিট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের রিটায়ারমেন্ট কনফিডেন্স সার্ভেও কর্মীদের আস্থা ছয় শতাংশ কমে ৬১ শতাংশে নেমে এসেছে। ঋণের বোঝাও পরিস্থিতি আরও জটিল করছে—এনআইআরএসের প্রতিবেদনে ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ঋণ একটি বড় সমস্যা, এবং ৭৭ শতাংশ জানিয়েছেন, ঋণের কারণে অবসরের জন্য যথেষ্ট সঞ্চয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ওয়ালেটহাবের জরিপেও একই চিত্র—৫৩ শতাংশ বলেছেন, অবসরে সঞ্চয় করার চেয়ে ঋণ পরিশোধকে তাঁরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফরচুনের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬০ বছর বয়সের কাছাকাছি থাকা প্রায় চারজন মার্কিনের মধ্যে একজনের কোনো অবসর অ্যাকাউন্টই নেই।

চাপ সত্ত্বেও কর্মীরা অবসর সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এনআইআরএসের তথ্য বলছে, বর্তমানে কর্মরতদের ৭৫ শতাংশ মনে করেন, চাকরি বেছে নেওয়ার সময় অবসর সুবিধা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; ৪১ শতাংশ জানিয়েছেন, গত এক বছরে এই সুবিধাগুলোর গুরুত্ব তাঁদের কাছে আরও বেড়েছে। তবে অবসর আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে সামগ্রিক হতাশাও প্রকট। এনআইআরএসের প্রতিবেদনে ৮০ শতাংশ মার্কিন মনে করেন, দেশটি অবসর সংকটের মুখোমুখি—২০২০ সালে এই হার ছিল ৬৭ শতাংশ। ওয়ালেটহাবের অর্ধেক উত্তরদাতা (৫০ শতাংশ) বলেছেন, সাধারণ মার্কিন নাগরিকের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যে অবসরে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

এই সংকট নিয়ে ফরচুনের বিশ্লেষণে টিআইএএ-এর প্রধান নির্বাহী ঠাসুন্ডা ব্রাউন ডাকেট সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবসর সঞ্চয়ের ঘাটতি ৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা একটি প্রকৃত সংকট। তাঁর মতে, প্রায় ৪০ শতাংশ মার্কিনের অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কিছু মানুষের জন্য অবিরাম কাজ করা শুধু অর্থের বিষয় নয়—৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ২০ শতাংশ এখন চাকরিতে আছেন, যা ৩৫ বছর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য কখনো কাজ শেষ না হওয়ার সম্ভাবনা আনন্দের নয়, বরং ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নতুন কিছু জটিলতাও দেখা দিচ্ছে। এনআইআরএসের প্রতিবেদনে ৫৩ শতাংশ মার্কিন কর্মপরিকল্পনায় ক্রিপ্টোকারেন্সি অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করেছেন; ৭৭ শতাংশ মনে করেন, এই ধরনের পরিকল্পনায় ক্রিপ্টো ঝুঁকিপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্পর্কেও অনুরূপ সন্দেহ রয়েছে—প্রায় ৪৫ শতাংশ বলেছেন, আর্থিক পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে এআই-এর ভূমিকায় তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, যদিও অনেকেই প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছেন।

এনআইআরএসের নির্বাহী পরিচালক ড্যান ডুনান প্রতিবেদনে বলেছেন, “মার্কিনরা আমাদের জানাচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনের খরচ মেটাতে গিয়ে অবসরের নিরাপত্তা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, ঋণ ও অন্যান্য ব্যয় অবসরের জন্য সঞ্চয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। একই সময়ে, অবসরের ল্যান্ডস্কেপ জটিল হওয়ায় আমেরিকানরা এআই ও ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন।”