বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিলিয়নিয়ার মাইক ব্লুমবার্গের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া। প্রায় ৪৪ বছর আগে, বিনিয়োগ ব্যাংক স্যালোমন ব্রাদার্সে অংশীদার পদ থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি সেখানে ১৫ বছর ক্যারিয়ার গড়েছিলেন—শুরুর দিকে বার্ষিক ৯ হাজার ডলার বেতনে কেরানি হিসেবে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠেছিলেন। ফিব্রো কর্পোরেশনের সাথে স্যালোমনের একীভূতকরণের সময় চাকরি হারানোর পর তিনি আর কখনো ঐতিহ্যবাহী পূর্ণকালীন চাকরিতে ফেরেননি।
গত বছর ফরচুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্লুমবার্গ বলেন, “স্যালোমন থেকে বরখাস্ত হওয়া আমাকে একটি শিক্ষা দিয়েছে যা আমি ব্যবসা, সরকার ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে সারাজীবন বহন করেছি—প্রতি ব্যর্থতাই একটি সুযোগ। যদি আমাকে বরখাস্ত না করা হতো, তাহলে হয়তো ব্লুমবার্গ প্রতিষ্ঠা হতো না, মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতাম না, আর বিশ্বের বড় সমস্যা সমাধানে কাজ করা ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিজের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগও পেতাম না।”
চাকরি হারানোর বেদনা নিয়ে বসে থাকেননি তিনি। বরখাস্ত হওয়ার পরের দিনই তিনি ইনোভেটিভ মার্কেট সল্যুশনস নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা পরে ব্লুমবার্গ এলএলসি হিসেবে পরিচিত হয়। থমাস সেকুন্ডা, ডানকান ম্যাকমিলান ও চার্লস জেগারের সাথে যৌথভাবে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন। স্যালোমন থেকে পাওয়া ১০ মিলিয়ন ডলারের বিচ্ছেদ প্যাকেজই ছিল প্রাথমিক পুঁজি। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্লুমবার্গ তার কোম্পানির ৮৮ শতাংশ মালিক, যার আনুমানিক বার্ষিক আয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। তার নিজের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০৯.৪ বিলিয়ন ডলার।
ব্লুমবার্গ স্বীকার করেন, বরখাস্ত হওয়ার সময় কষ্ট পেয়েছিলেন, কারণ কোম্পানিটি তার জীবনের ১৫ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। তবে তিনি বলেন, “যখন আপনাকে ছিটকে দেওয়া হয়, তখন উঠে দাঁড়াতে হয় এবং এগিয়ে যেতে হয়। আমি কখনো পেছনে তাকাই না। অতীত বদলানো যায় না, তাই কেন সেটি নিয়ে ভাবব? আর যদি কখনো ব্যর্থ না হন, তাহলে আপনি যথেষ্ট উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করেননি। জীবন খুব ছোট, ঢালু পথে আটকে থাকার জন্য নয়।”
এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতাও বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, “আমি স্যালোমনে কাজ করতে ভালোবাসতাম, হয়তো পুরো ক্যারিয়ার সেখানেই কাটিয়ে দিতাম। পরিকল্পনা করা ভালো, কিন্তু পরিকল্পনাকে কাজের পথে বাধা হতে দেওয়া উচিত নয়। সেরা পরিকল্পনাও প্রায়ই ভেস্তে যায়, তাই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা থাকা জরুরি।”
এছাড়াও, এই ঘটনা তার মধ্যে আনুগত্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা তৈরি করেছে। নিজের কোম্পানিতে তিনি কর্মীদের দীর্ঘ চাকরির স্বীকৃতিস্বরূপ স্মারক ফলক প্রদান করেন। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ব্লুমবার্গের ২৬ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছেন, যাদের গড় চাকরির মেয়াদ ৭.৮ বছর। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের সাধারণ কর্মীদের গড় চাকরির মেয়াদ প্রায় ৩.৯ বছর।
ব্লুমবার্গের অফিসগুলো বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশে বিস্তৃত। তিনি জানান, সেখানে “সহযোগিতা ও সৃজনশীলতা” বাড়ানোর জন্য কোনো দেয়াল বা ব্যক্তিগত অফিস নেই, প্রতিটি কর্মী একই আকারের ডেস্ক পান। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ যখন নিজেকে মূল্যায়িত বোধ করে না, বিশেষ করে তরুণরা, তখন তারা কোম্পানি ছেড়ে চলে যায়। এই নীতি অনুসরণ করেই তিনি কর্মীদের ধরে রাখছেন। তিনি বলেন, “এই অভিজ্ঞতা আমাকে আনুগত্য ও কঠোর পরিশ্রমের পুরস্কারের মূল্য শিখিয়েছে। ব্যবসায় এমন দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক দিন দিন বিরল হয়ে যাচ্ছে, তবে আমাদের কোম্পানিতে মানুষকে বিনিয়োগ ও ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ দেওয়া বন্ধ করিনি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।”



