যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে অপ্রত্যাশিত সমস্যা তৈরি করছে, যার প্রভাব এখন সরাসরি পড়তে শুরু করেছে দেশের চাকরির বাজারে। হোয়াইট হাউস শুরুতে এই সামরিক অভিযান স্বল্পমেয়াদী হবে বলে আশা করালেও, সাত মাস পর এর অর্থনৈতিক প্রভাব শ্রমিকদের পেশাগত প্রত্যাশাকে বদলে দিচ্ছে। নিয়োগকারী প্ল্যাটফর্ম 'মনস্টার'-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ সম্ভাব্য চাকরিপ্রার্থী জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দামের কারণে তাদের চাকরির খোঁজার অগ্রাধিকার পরিবর্তন করছেন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২৩ শতাংশ কর্মী এখন তাদের বাড়ির কাছাকাছি চাকরির খোঁজ করছেন এবং ১৭ শতাংশ তাদের বেতন প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছেন যাতে যাতায়াতের উচ্চ খরচ পুষিয়ে নেওয়া যায়। এছাড়া ২০ শতাংশ পুরোপুরি রিমোট বা দূরবর্তী কাজের সুযোগকে প্রাধান্য দিচ্ছেন এবং মাত্র ৫ শতাংশ সরাসরি অফিসে গিয়ে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মিড-গ্রেড গ্যাসের গড় দাম গ্যালন প্রতি ৫ ডলার ছাড়িয়েছে এবং ডিজেলের দাম ৬.৫০ ডলারের উপরে। এক বছর আগে সাধারণ গ্যাসের দাম যেখানে ছিল গ্যালন প্রতি ৩.১৫ ডলার, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.১০ ডলারে।

মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। আজ সকালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছেছে। পার্সিয়ান উপসাগর থেকে তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালীর পাশে ইরানের অবস্থান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রণালীর ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ দাবি করলেও, জাহাজগুলোর সেখানে যাতায়াতে অনীহার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং দাম বাড়ছে। নিউইয়র্কে মার্কিন-ইরান আলোচনার প্রাক্কালে উত্তেজনা প্রশমনের আশা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘে বলেছেন যে তারা কখনোই মাথা নত করবে না, তবে কূটনীতির পথ খোলা আছে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনা অথবা শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার মতো কঠিন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।

জ্বালানির দাম এভাবে বাড়তে থাকলে নিয়োগকর্তাদের নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। জরিপে দেখা গেছে, পছন্দের যাতায়াতের সময়ের চেয়ে আরও ২০ মিনিট বেশি সময় ব্যয় করতে হলে ৩২ শতাংশ আমেরিকান অন্তত ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি চান। ১০ শতাংশ কর্মী ১০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি এবং ১১ শতাংশ নমনীয় বা হাইব্রিড কাজের সময়সূচীর বিনিময়ে দীর্ঘ যাতায়াতে রাজি হতে পারেন। ৯ শতাংশ জ্বালানি খরচের রিইম্বার্সমেন্ট বা অর্থ ফেরত চাইলে রাজি হবেন, তবে ৩০ শতাংশের মতে টাকা বা নমনীয়তা কোনোটিই তাদের দূরে যাতায়াত করতে প্রলুব্ধ করবে না।

যাতায়াতের কষ্ট ও খরচ অনেক ক্ষেত্রে ক্যারিয়ারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রায় ১,০০০ উত্তরদাতার মধ্যে ৪৯ শতাংশ জানিয়েছেন, যাতায়াতের খরচ বা দূরত্বের কারণে তারা ভালো চাকরির সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। এছাড়া ৭৫ শতাংশ মনে করেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এখন কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য (work-life balance) বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বৃহত্তম ওয়ার্কস্পেস প্রোভাইডার আইডব্লিউজি-র সিইও মার্ক ডিকসন মনে করেন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে যাতায়াতের এই সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তার মতে, ভবিষ্যতে মানুষ অবাক হয়ে ভাববে যে এক সময় কম্পিউটারে কাজ করার জন্য শত মাইল দূরে অফিসে যেতে হতো। তবে বর্তমান পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, নিউ ইয়র্ক, ডিসি, এলএ এবং অস্টিনের মতো ১০টি বড় শহরে অফিসের গড় উপস্থিতি এখন ৫৩ শতাংশে স্থির হয়েছে।