দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি রূপান্তরকে মূলত পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের বিষয় হিসেবে দেখে এসেছে। সস্তা এবং নিরাপদ গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা থাকায় জ্বালানির নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক ব্যয় নিয়ে খুব একটা চিন্তিত হতে হতো না। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ এই পুরো সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন প্রতিষ্ঠান হানিওয়েল টেকনোলজিস-এর কৌশল ও বৈশ্বিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট অনন্ত মহেশ্বরীর মতে, যুদ্ধের আগে গ্যাসের সরবরাহ এবং এর খরচ এতটাই কম ছিল যে কোনো বড় ঝুঁকির কথা ভাবা হয়নি। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানির প্রাপ্যতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং পাওয়া গেলেও তার দাম অনেক বেশি।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইউরোপের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হলো এমন এক জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যা একই সাথে পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ হবে। মহেশ্বরীর মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে চীন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। চীনের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং কয়লা ছাড়া অন্যান্য প্রধান জ্বালানির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ খুব সীমিত। এর সমাধানে তারা সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োফুয়েল, টেকসই বিমান জ্বালানি এবং কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তিতে দ্রুত বিনিয়োগ করেছে। চীন কেবল বিনিয়োগের পরিমাণে নয়, বরং প্রযুক্তির বহুমুখিতা এবং দ্রুত প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এগিয়ে। অন্যদিকে, ব্রাজিল বায়োফুয়েলে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যেখানে তারা কৃষি সম্পদ এবং বিশেষ করে চিনি আখ ও দেশীয় পাম গাছ (মাকাউবা) ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি তৈরি করছে, যা বিমান চলাচলের মতো কঠিন খাতে ব্যবহৃত হতে পারে।
ইউরোপের নিজস্ব কিছু শক্তিশালী দিক রয়েছে, যেমন—বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, উন্নত গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা এবং দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারিং জনবল। তবে প্রশ্ন হলো, ইউরোপ তার এই সক্ষমতাকে কত দ্রুত কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে পারবে। মহেশ্বরীর মতে, ইউরোপের উচিত এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা যা শিল্পখাতের গতিকে মন্থর না করে বরং ত্বরান্বিত করে। ২০২৪ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জ্বালানির ৪৮ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস এবং ২৮ শতাংশ পরমাণু শক্তি থেকে এসেছে। তবে তিনি মনে করেন, নবায়নযোগ্য ও পরমাণু শক্তির পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের সঠিক ব্যবহার এবং জীবাশ্ম জ্বালানির নিঃসরণ কমিয়ে আনতে হবে।
নতুন জ্বালানি উৎসের সন্ধানের চেয়ে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি করা এখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের একটি ফাস্ট ফুড চেইন তাদের ৬০০টি স্টোরের জ্বালানি ব্যবহারের কেন্দ্রীয় নজরদারি চালু করার পর দেখেছে যে, কিছু স্টোরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বালানি অপচয় হচ্ছিল। এই অপচয় রোধ করেই বড় ধরনের সাশ্রয় সম্ভব।
এই প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এক নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। প্রচলিত বিল্ডিং কন্ট্রোল সিস্টেম নির্দিষ্ট নিয়মে চলে, কিন্তু এআই মানুষের উপস্থিতি বা পরিবেশের পরিবর্তন বুঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মহেশ্বরী একে 'ফিজিক্যাল এআই' বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ফিজিক্যাল এআই-এর মাধ্যমে ভবন, কারখানা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও স্বায়ত্তশাসিত করা সম্ভব। যেমন, ফায়ার ডিটেক্টরের রিমোট টেস্টিংয়ের মাধ্যমে দিনের কাজ কয়েক ঘণ্টায় নামিয়ে আনা যায়। এছাড়া, বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে সৃষ্ট শ্রমিক সংকটের সমাধানে এআই মানুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল কেন্দ্রে রেখে দ্রুত ও সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারে। পরিশেষে, মহেশ্বরী মনে করেন, বিশ্ব এখন কত বেশি শক্তি উৎপাদন করবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বিদ্যমান শক্তিকে কীভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে এবং দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা যায় তার ওপর।




