সিডনির ব্যস্ত রাজপথে যেখানে সবাই গন্তব্যের তাড়ায়ে ছুটছেন, সেখানে এক কোণে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ পথশিল্পীর বেহালা বাদন তন্ময় হয়ে শুনছিলেন জেমস। কোনো মঞ্চের চাকচিক্য বা হাজারো দর্শকের ভিড় ছাড়াই সেই মুহূর্তে সুরের মায়ায় ডুবে ছিলেন তিনি। মাত্র চার দিন আগেই ১২ সেপ্টেম্বর রাতে সিডনির নরওয়েস্টের হিলসং কনভেনশন সেন্টারের মঞ্চে গিটার হাতে উন্মাদনা ছড়িয়েছিলেন এই নগরবাউল। কলকাতার ফসিলস ব্যান্ডের রূপম ইসলামের সঙ্গে তাঁর সেই কনসার্টে ‘মা’, ‘তারায় তারায়’ এবং ‘দুষ্টু ছেলের দল’-এর মতো জনপ্রিয় গানে মেতেছিলেন অগণিত শ্রোতা। তবে আলোর ঝলকানি আর করতালির সেই জেমস কনসার্ট শেষে সম্পূর্ণ বদলে যান। সেখানে দেখা মেলে একজন শান্ত, কৌতূহলী এবং গভীর পর্যবেক্ষক জেমসের।

কনসার্ট পরবর্তী চার দিন সিডনিতে জেমস কাটিয়েছেন অত্যন্ত সহজভাবে। স্বল্পভাষী এই শিল্পী কোনো তারকাসুলভ আড়ম্বর বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা ছাড়াই শহরের সাধারণ পর্যটকদের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন। একদিন বিকেলে পথশিল্পীর বেহালা শোনার সময় তিনি দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, সেখানে নিজের পরিচয় দেওয়া বা শিল্পীর পরিচয় জানার কোনো তাড়াহুড়া ছিল না; কেবল সুরের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল এক নীরব যোগাযোগ। একইভাবে সিডনির বাণিজ্যিক এলাকার বিভিন্ন বিপণিবিতানে সাধারণ ক্রেতার মতো কেনাকাটা করেছেন তিনি। স্ত্রীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা এবং একটি অভিজাত দোকান থেকে সময় নিয়ে পছন্দের সুগন্ধি বেছে নেওয়ার সময় আশপাশের কেউ বুঝতে পারেননি যে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের রকসংগীতের কিংবদন্তি।

সংগীতের পাশাপাশি আলোকচিত্রের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের অনুরাগ সিডনি সফরের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিফলিত হয়েছে। ক্যামেরা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কখনো আয়োজক বেঙ্গলি সিনে ক্লাবের সদস্য তানিম মান্নান, প্রসেনজিৎ রায় ও সৈকত মণ্ডলের সঙ্গে, আবার কখনো আহসান এলাহী ফান্টি, তালুকদার সাব্বির, ইশমামুল ফরহাদ, আবদুল কাইয়ুম ও রুবাইয়াত ঠাকুরের সঙ্গে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। কিরিবিলির ঘাট কিংবা অপেরা হাউস চত্বরের গোধূলি বেলা এবং হারবার ব্রিজের দৃশ্যগুলো তিনি ধরে রেখেছেন তাঁর ক্যামেরার লেন্সে। ছবি তোলার সময় তাঁর একাগ্রতা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন কোনো বিশেষ আলোকচিত্র প্রকল্পের কাজ করছেন।

কিরিবিলির ঘাটে এক মজার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাঁর। নিজেদের ছবি তোলার জন্য এক বিদেশি পথচারীকে অনুরোধ করলে জানা যায় ওই ব্যক্তি নিজেও একজন পেশাদার আলোকচিত্রী। তিনি অত্যন্ত কড়াভাবে জেমসকে পোজ দেওয়ার নির্দেশ দিতে থাকেন, যা দেখে তাঁর সঙ্গীরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও জেমস তা বেশ উপভোগ করেন এবং হাসিমুখে প্রতিটি নির্দেশনা মেনে চলেন।

শহরের রাস্তায় গাড়িতে ভ্রমণের সময় জেমস শুনছিলেন ফরাসি জ্যাজ। ভাষা না বুঝলেও সুরের আবেগে ডুবে থেকে তিনি জানান, গানের ভাষা বা ভূগোলের কোনো সীমানা নেই; সুর সরাসরি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। আড্ডার মাঝে উঠে এসেছে ঢাকার রিকশার স্মৃতি এবং তাঁর জনপ্রিয় গান তৈরির পেছনের গল্প। তবে নিজের চেয়ে অন্যের কথা শুনতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন তিনি। এছাড়া সিডনির কনসার্টে বাংলাদেশ ও কলকাতার দর্শকদের এক হওয়ার বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তিনি বলেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে পুরো বাংলাকে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে, যেখানে কোনো বিভাজন নেই; বরং বাংলাদেশ, কলকাতা, সিডনি বা আমেরিকা—সব বাঙালিই এক আত্মিক টানে যুক্ত।

অবশেষে ১৬ সেপ্টেম্বর মেলবোর্নের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে প্রশান্ত মুখে বিদায় জানান জেমস। ১৯ সেপ্টেম্বর মেলবোর্ন কনসার্ট শেষে তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। মঞ্চের সেই উন্মাদনাপূর্ণ ব্যক্তিত্বের আড়ালে এই চার দিনে তাঁর সঙ্গীরা খুঁজে পেয়েছেন একজন নিরহংকার এবং প্রাণখোলা মানুষকে।