ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ‘মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের ভূমিকা: চ্যালেঞ্জ নিরসনে করণীয়’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সাজেদা ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনায় সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে উঠে আসে যে, বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগলেও তাদের বড় অংশই চিকিৎসার বাইরে রয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার তার বক্তব্যে জানান, মানসিক স্বাস্থ্যকে কেবল হাসপাতালকেন্দ্রিক সেবা হিসেবে দেখলে চলবে না। গর্ভকাল থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সমস্যা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে হবে। তিনি মনে করেন, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ায় মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। সরকার ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে বিশেষ কর্নার স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ সচেতনতার অভাবকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের বিষণ্ণতা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে আমরা অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। সরকারি অবকাঠামোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের প্রযুক্তি ও দক্ষতাকে যুক্ত করে সেবা বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে এই বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী জাহেদা ফিজ্জা কবীর দক্ষ জনবলের তীব্র সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কেবল চিকিৎসক বাড়িয়ে এই ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়, বরং কমিউনিটি পর্যায়ে প্যারা কাউন্সিলরের মতো সহায়ক পেশাজীবী তৈরি করতে হবে। তিনি মানসিক স্বাস্থ্য আইনের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং মনোবিজ্ঞানীদের পেশাগত মান নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ‘প্রশান্তি’ আবাসিক মডেলের অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার এবং পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটের কথা তুলে ধরেন। ডা. সাইফুন নাহার জানান, প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪.৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে। অন্যদিকে ডা. শাফকাত ওয়াহিদ প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সুলভ মূল্যের প্রয়োজনীয় ওষুধের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অনেক সময় পরিবারের নেতিবাচক আচরণ বা ‘হাই এক্সপ্রেসড ইমোশন’ রোগীর সুস্থতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি হাসিনা মমতাজ এবং সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সির উপদেষ্টা ডা. জহিরুল ইসলাম মানসিক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেন। তাদের মতে, সীমিত বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বৈঠকে অন্যান্য বক্তারা মানসিক রোগীদের পুনর্বাসন, সামাজিক একীভূতকরণ এবং তাদের জন্য জীবিকার সুযোগ তৈরির কথা বলেন। সিটি ব্যাংক এনএ ফাউন্ডেশনের রুমানা আহমেদ উদ্ভাবনী প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহহীন ও মানসিক রোগীদের সহায়তার কথা উল্লেখ করেন। ইনোভেশন ফর ওয়েলবিয়িং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান মানসিক স্বাস্থ্য খাতের অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন যাতে তারা আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
সেবাগ্রহীতা রূপা আক্তার তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে বলেন, কেবল চিকিৎসা নয়, মানসিক রোগীদের সম্মান এবং সমাজে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
আলোচনার শেষে কয়েকটি মূল সুপারিশ করা হয়: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে যুক্ত করা, চিকিৎসক ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান, মানসিক স্বাস্থ্য আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, সরকারি অবকাঠামো ও বেসরকারি সক্ষমতার সমন্বয় এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা।




