বৃষ্টিভেজা এক দিনে সুইডেনের মালমো শহরে পা রেখেছিলেন কাজল। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন এয়ারপোর্টে নামার পর থেকেই সেখানকার পরিকল্পিত নগরীর সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে। তবে স্বপ্নের দেশটির বাস্তবতায় প্রথম দিকেই তাকে মুখোমুখি হতে হয় কঠোর সংগ্রামের। শুরুর দিনগুলোতে একজন সিনিয়র ভাইয়ের সাথে মেসে থেকে জীবন শুরু করেন তিনি। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের রান্নাবান্না এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নিজেরাই পালন করতে হতো। সুইডিশ ভাষা জানা না থাকায় ভালো কাজের সুযোগ ছিল সীমিত, ফলে বেশিরভাগ বাংলাদেশি ছাত্ররা ভারতীয় রেস্টুরেন্টে কাজ খোঁজার চেষ্টা করত।
লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও শুরুতেই তাকে মানসিক ও আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়। পরিবারের প্রত্যাশা এবং নিজের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তিনি বেশ উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যান। বিশেষ করে একাডেমিক রাইটিং এবং সেমিনার ভিত্তিক পড়াশোনার ধরন বাংলাদেশের চেয়ে ভিন্ন হওয়ায় প্রথম দিকে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়। তবে কঠোর গবেষণার মাধ্যমে তিনি দ্রুত সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেন।
কাজের সন্ধানে ঘোরার সময় তিনি অনেকবার প্রত্যাখ্যাত হন। এমনকি এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট মালিকের কাছ থেকে কড়া কথা শুনতে হয়। তবে দমে না গিয়ে তিনি প্রথমে অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য ফার্নিচার ডেলিভারির কাজ শুরু করেন। ভোর চারটে থেকে রাত পর্যন্ত ভারী আসবাবপত্র বহনের এই কঠিন কাজ করে তিনি নিজের টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যান। প্রায় ছয় মাস পর সুপারিশের মাধ্যমে মালমোতে একটি মোটামুটি বেতনের চাকরি পান তিনি। এর ফলে তার জীবনযাত্রায় কিছুটা স্থিতি আসে এবং তিনি পরিবারের সদস্যদের সুইডেনে আনার আবেদন করেন। আট মাস পর স্ত্রী ও তিন বছরের কন্যা তুষিকে কোপেনহেগেন এয়ারপোর্টে পাওয়ার মুহূর্তটি ছিল তার জীবনের এক অনন্য অনুভূতি।
সুইডেনের সমাজকল্যাণমূলক ব্যবস্থা কাজলের পরিবারকে অনেক সহায়তা দেয়। মেয়ের স্কুল এবং চিকিৎসার খরচ প্রায় বিনামূল্যে হওয়ায় বড় ধরনের চাপ কমে। তবে তার মূল লক্ষ্য ছিল সুইডেনে স্থায়ী হওয়া। তিনি জানতে পারেন, নির্দিষ্ট ক্রেডিট সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা ফুলটাইম চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে স্থায়ী রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন করতে পারে। ব্যবসায়ী হিসেবে স্থায়ী হতে হলে টানা দুই বছর ব্যবসা পরিচালনা করে পরিবারের ভরণপোষণের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হয় এবং সরকারের কোনো আর্থিক সাহায্য নেওয়া নিষিদ্ধ থাকে।
টাকা উপার্জনের চেয়ে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্নকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজল তার পুরোনো চাকরি ছেড়ে নতুন ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি এবং তার স্ত্রী কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যবসাটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কর প্রদান এবং কঠোর নিয়মের মধ্য দিয়ে তিনি এখন তার স্থায়ী নাগরিকত্বের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে চলেছেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসেননি।




