লক্ষ্মীপুর জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখন বইছে সুপারির জোয়ার। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এই জেলায় পাকা, শুকনো এবং ভেজানো মিলিয়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি কেনাবেচা হতে পারে। বিশেষ করে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসকে কেন্দ্র করে এই সংগ্রহের কাজ সবচেয়ে বেশি চলে, যা স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনছে।

সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেহমনী বাজারের দৃশ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাস্তার পাশে সুপারির বিশাল স্তূপ জমে থাকে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা গ্রামের ছোট হাট থেকে সুপারি সংগ্রহ করে এখানে আনেন, আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকাররা তা কিনে নিয়ে যান। কেবল তেহমনী বাজারেই প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দেড় কোটি টাকার লেনদেন হয়। এছাড়া রায়পুর উপজেলার হায়দাগঞ্জ, আলিয়া মাদ্রাসা, বাসাবাড়ি, দেনায়েতপুর, খাসেরহাট, মোল্লারহাট ও মীরগঞ্জ এবং লক্ষ্মীপুর সদরের দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী ও দত্তপাড়াসহ রামগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে দিনরাত সুপারির কেনাবেচা চলছে।

সুপারি প্রধানত তিনভাবে বাজারজাত করা হয়—পাকা, ভেজানো এবং শুকনো। বর্তমানে পাকা সুপারির চাহিদা বেশি, যার প্রতি পণ (৮০টি) ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় এবং প্রতি কাউন (১ হাজার ২৮০টি) ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, মোট উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ সুপারি নদী-নালা, পুকুর বা চৌবাচ্চায় ভিজিয়ে সংরক্ষণ করা হয়, আর বাকি ৪০ শতাংশ কাঁচা বা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় কৃষকদের মতে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে যখন বাগান পেকে যায়, তখন মজুতদারেরা সস্তায় সুপারি কিনে ভিজিয়ে রাখেন এবং জানুয়ারি-মার্চ মাসে দাম বাড়লে তা বাজারে ছাড়েন।

এই ব্যবসার ফলে কেবল বাগানমালিক বা পাইকাররা নন, সাধারণ শ্রমিকরাও লাভবান হচ্ছেন। গাছ থেকে সুপারি পাড়ার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের দৈনিক আয় এখন ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, রায়পুরের কেরোয়া এলাকার রুবেল হোসেন প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে উঠে সুপারি পাড়েন এবং প্রতি গাছ থেকে ১০ টাকা করে মজুরি পান। এই আয়ে তাঁর পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া সংগ্রহ, বাছাই ও পরিবহনের সাথে যুক্ত আরও অনেকে এখান থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

লক্ষ্মীপুরের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। একটি সুপারি গাছ থেকে ৩০ বছরের বেশি সময় ফলন পাওয়া সম্ভব বলে কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর ৭ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ হয়েছিল, যা বর্তমানে বেড়ে ৭ হাজার ২৫০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। গত বছর উৎপাদন ছিল ৪২ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন, এবার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টনে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ জানান, জেলার অধিকাংশ সুপারি আসে রায়পুর উপজেলা থেকে, এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে লক্ষ্মীপুর সদর। সুপারির বাজারের এই ইতিবাচক প্রভাব পুরো জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।