কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে সারের তীব্র সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে কৃষকেরা গত রোববার সকালে ধলডাঙ্গা বাজারে অবস্থিত একটি ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সার ফেরত দেন কৃষকেরা। উপজেলা প্রশাসন ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিলখুড়ি ইউনিয়নে আবাদি জমির তুলনায় সারের বরাদ্দ অনেক কম। সরকার নির্ধারিত পরিবেশকদের বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত খোলা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এক ইউনিয়নের বরাদ্দের সার অন্য ইউনিয়নে বিক্রি হয়ে যায়। পরিবেশকদের বেশির ভাগ গুদাম ইউনিয়নের বাইরে উপজেলা সদরে অবস্থিত। চাহিদার তুলনায় যতটুকু সার বরাদ্দ হয়, তাও সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছায় না।
জেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শিলখুড়ি ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, আমন ধান রোপণের পর প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। খোলাবাজার থেকে সরকারি দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে তাদের। পাগলার হাট এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি জানান, ধান রোপণের ২১ দিনের মধ্যে সার দেওয়ার নিয়ম থাকলেও ২৬ দিনেও তিনি সার পাননি। আরেক কৃষক আজিজুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধান চাষ করে নিজের বিপদ ডেকে এনেছেন— এখন সার খুঁজতে ঘুরবেন নাকি জমির পরিচর্যা করবেন, তা ভাবছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি রোপা আমন মৌসুমে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর বিপরীতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১২৪ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ রয়েছে। শিলখুড়ি ইউনিয়নে বরাদ্দ মাত্র ১১৯ দশমিক ৯ মেট্রিক টন, যেখানে আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। স্থানীয় কৃষকেরা প্রতি বিঘায় গড়ে ৮০ কেজি সার ব্যবহার করেন। সেই হিসেবে শিলখুড়িতে প্রায় ১ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন সার প্রয়োজন। এর মধ্যে ইউরিয়া সারের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি— প্রয়োজন প্রায় ৪৩৮ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টনের বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৬৮ মেট্রিক টন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুল জব্বার অবশ্য দাবি করেছেন, উপজেলায় ও প্রতিটি ইউনিয়নে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সারের সরবরাহ রয়েছে। তবে কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন স্বীকার করেছেন, শিলখুড়ি ইউনিয়নে প্রয়োজনের তুলনায় সার কম পৌঁছেছে, ফলে সেখানে সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য ইউনিয়ন থেকে সার সমন্বয় করে শিলখুড়িতে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সার বিতরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধও প্রকাশ পেয়েছে। শিলখুড়ির পরিবেশক তাইফুর রহমানের পরিবার জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীসহ কয়েকজনকে নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমানের শ্যালক আবদুল লতিফ অভিযোগ করেন, তাইফুরের সঙ্গে থাকা বিএনপির কয়েকজন নেতা সার বিক্রির ক্ষেত্রে কমিশন নেন এবং বাইরে সার বিক্রি করেন। তবে পরিবেশক তাইফুর রহমান পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী সার বিতরণের সময় উপস্থিত থাকায় আবদুল লতিফ ও তাঁর অনুসারীরা কৃষকদের উসকানি দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। এই ঘটনায় তিনি ভূরুঙ্গামারী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। উসকানির অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুল লতিফ বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্যই তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন।
অনিয়মের আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে সার বিতরণ প্রক্রিয়ায়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ৬১ হাজার ১৯০ জন কৃষকের জন্য বিসিআইসির ১০ জন এবং বিএডিসির সাতজন পরিবেশক রয়েছেন। শিলখুড়ি ইউনিয়নের বিসিআইসি পরিবেশকের প্রতিনিধি সহিদুল ইসলাম জানান, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নির্দেশে প্রতি চালানে ১০০ বস্তা করে সার বিএডিসির পরিবেশক নূর ইসলামকে দেওয়া হয়েছে। নূর ইসলাম স্বীকার করেছেন, তাঁর কাছে আসা সার তিনি খোলাবাজারে ৫ ও ১০ কেজি করে বিক্রি করেন। তবে তিনি দাবি করেন, সরকার নির্ধারিত দামেই তিনি সার বিক্রি করেন। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বার বলেন, খুচরা বিক্রেতা বা বিএডিসি পরিবেশককে সার দেওয়ার বিধান নেই। তবে ওই পরিবেশক কার্ডধারী হওয়ায় কিছু সার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। গত রোববার পাগলার হাট বাজারে নূর ইসলামের দোকানে অভিযান চালিয়ে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে সার বিক্রির অভিযোগে তাঁকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিসিআইসি পরিবেশকের সার কেটে বিএডিসি পরিবেশকের বিক্রয়কেন্দ্রে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ কাজ করে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




