দীর্ঘ দুই-তিন দশক আগে সাজানো-গোছানো থাকলেও বর্তমানে কুমিল্লা শহর চরম বিশৃঙ্খল নগরায়ণের কবলে। সরু রাস্তা, ফুটপাথের অভাব, তীব্র যানজট এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী। পরিস্থিতি এমন যে, আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিস্তার, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত আবাসন এবং শহরের চারধারে নিয়ন্ত্রণহীন বসতি গড়ে ওঠায় শহরের বাসযোগ্যতা এখন হুমকির মুখে। এই সংকটময় মুহূর্তে শহরের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে এবং জনদাবির প্রেক্ষিতে সরকার গঠন করেছে 'কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ'।

গত ১০ এপ্রিল এই কর্তৃপক্ষের জন্য প্রয়োজনীয় আইন পাস করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কেবল ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করে মহাপরিকল্পনা ও কৌশলগত অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। বিশেষ করে, যত্রতত্র ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ, জলাশয় ও কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং নাগরিক সুবিধার জন্য উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করা হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য। আইনে কর্তৃপক্ষকে অবৈধ, ঝুঁকিপূর্ণ বা নকশার বাইরে নির্মিত স্থাপনা অপসারণ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ১১ জুন দায়িত্ব গ্রহণকারী চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী (আবু) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কেবল জমির মালিকানা থাকলেই কেউ ইচ্ছেমতো ভবন নির্মাণ করতে পারবেন না; সব ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম ও কোড অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া সেবার মানোন্নয়নে পুরো প্রক্রিয়াটিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কুমিল্লার বর্তমান সংকট দূর করতে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং বিনোদন কেন্দ্রের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ না করে শহর সম্প্রসারণ করলে বর্তমান সমস্যা আরও প্রকট হবে। তাই 'যেখানে জমি সেখানেই ভবন'—এই মানসিকতা বদলে কোন জমির জন্য কোন ব্যবহার উপযুক্ত, তা নির্ধারণ করা জরুরি। একইসঙ্গে নিম্নবিত্ত, বস্তিবাসী ও গৃহহীন মানুষের আবাসনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে আইনে।

শহরের পরিবেশ রক্ষা এবং জলাবদ্ধতা কমাতে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ, খাল ও পুকুর সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী সতর্ক করে বলেছেন, নগর সম্প্রসারণের নামে জলাধার ভরাট হলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়বে। অন্যদিকে, পুরোনো শহরের জরাজীর্ণ এলাকাগুলো সংস্কারের জন্য 'আরবান রিডেভেলপমেন্ট' বা শহর পুনঃ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে খণ্ডিত জমি একত্র করে রাস্তা, ড্রেন ও পার্কের জায়গা রাখা সম্ভব হবে। এছাড়া সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে সংলগ্ন এলাকাগুলোকেও গেজেটের মাধ্যমে এই কর্তৃপক্ষের আওতায় আনা যেতে পারে।

কুমিল্লাকে পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা (টিপু) জানিয়েছেন, উভয় প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য এক হওয়ায় তারা একে অপরকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে। যদিও দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত উন্নয়নের ক্ষতি দ্রুত দূর করা কঠিন, তবে নতুন নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে একটি বাসযোগ্য কুমিল্লা গড়া সম্ভব। এই বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, এখন থেকে কুমিল্লায় কোনো অপরিকল্পিত কাজ হতে দেওয়া হবে না, যা হবে শহরের সবচেয়ে বড় গুণগত পরিবর্তন।