আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বলের গতি এত বেশি যে, কেবল চোখের দেখায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে শট খেলা প্রায় অসম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে মনে হতে পারে ব্যাটসম্যানরা বল দেখে খেলছেন, কিন্তু এর পেছনে কাজ করে গভীর বিজ্ঞান ও দীর্ঘদিনের অনুশীলন। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট লেখক জ্যারড কিম্বার তাঁর ‘দ্য আর্ট অফ ব্যাটিং’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, দক্ষ ব্যাটসম্যানরা এক ধরনের বিশেষ ক্ষমতায় অভ্যস্ত হন, যা তাঁদের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার মাঝেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
প্রখ্যাত ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ ড. শেরিল কালডার এবং বিজ্ঞানী বব উলমার ও জন বুকাননের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ার সময় ২০০ মিলিসেকেন্ড, অথচ ১৫০ কিমি গতিতে আসা বল ব্যাটসম্যানের কাছে পৌঁছাতে সময় নেয় ৫০০ মিলিসেকেন্ড বা তারও কম। এই অতি সামান্য সময়ে বল অনুসরণ করে শট খেলা শারীরিকভাবে কঠিন। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বল ছাড়ার পর যদি হঠাৎ আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়, তবে অপেশাদার ব্যাটসম্যানরা ভুল শট খেললেও পেশাদাররা সঠিক শট খেলতে পারেন। এর কারণ হলো, পেশাদাররা বলের গতিপথের প্রথম অংশ দেখেই মস্তিষ্কের অবচেতন স্তরে তৈরি হয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনুমানের মাধ্যমে খেলেন।
ব্যাটসম্যানরা মূলত কিছু নির্দিষ্ট সূত্র বা 'কিউ' (Cue) অনুসরণ করেন। যেমন—ফিল্ডারদের অবস্থান দেখে তারা বুঝতে পারেন বলটি অফ-স্ট্যাম্পের বাইরে হবে নাকি ফুল লেংথে পড়বে। এছাড়া বোলারের রান-আপ, হাত ছাড়ার ভঙ্গি, আঙুলের গ্রিপ এবং রিলিজের মুহূর্ত বিশ্লেষণ করে তারা বাউন্স ও লাইন আন্দাজ করেন। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইনের মতে, শরীরের অন্যান্য পেশির মতো চোখও একটি পেশি, যাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা যায়। ম্যাট প্রায়রের মতো কেউ একে 'টিভি দেখার' সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে চারপাশ ঝাপসা করে কেবল মাঝের নির্দিষ্ট বিন্দুতে মনোযোগ দেওয়া হয়।
তবে দৃষ্টিশক্তির অভাব সবসময় ব্যাটিংয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডন ব্র্যাডম্যানের দৃষ্টিশক্তিকে 'দুর্বল' বলা হলেও তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল অবিশ্বাস্য। ভারতের মনসুর আলি খান পতৌদি এক চোখ হারিয়েও ছয়টি টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন। অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডের রস টেলর 'পটেরেজিয়াম' নামক চোখের রোগে আক্রান্ত হয়ে রাতে বল দেখতে সমস্যায় পড়লেও তাঁর ক্যারিয়ারের গড় খুব একটা প্রভাবিত হয়নি।
তবে কিছু বিশেষ বোলিং অ্যাকশন ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করে। পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ার মুত্তিয়া মুরালিধরনের বোলিং পড়তে হিমশিম খেয়েছিলেন কারণ মুরালি প্রচলিত অফ-স্পিনারদের মতো নন, বরং তাঁর বল আসত হাতের পেছন দিক থেকে (ব্যাক অফ দ্য হ্যান্ড)। এই ভিন্নধর্মী অ্যাকশনের কারণে আনোয়ারের মনে হয়েছিল তিনি বলটি ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছেন না, এমনকি তিনি চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পর্যন্ত নিয়েছিলেন। আবার বীরেন্দর শেবাগ অজন্তা মেন্ডিসের রহস্যময় ক্যারম বলের মোকাবিলা করতে পেরেছিলেন কারণ তিনি তাঁকে সাধারণ অফ-স্পিনার হিসেবেই বিবেচনা করে খেলেছিলেন। সব মিলিয়ে, পেশাদার ক্রিকেটে ব্যাটিং কেবল দেখার বিষয় নয়, বরং এটি দেখা, শোনা এবং অবচেতন অনুমানের এক জটিল সমন্বয়।




