কিশোর আলোর ১৩তম জন্মদিনের আনন্দ পাঠকের সাথে ভাগ করে নিতে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী ১ অক্টোবর এই জন্মদিনের কথা মাথায় রেখে, কিশোর আলোর পূর্বসূরী হিসেবে পরিচিত ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত নববর্ষ সংখ্যার লেখাগুলো ধারাবাহিকভাবে কেবল কিশোর আলো অনলাইনেই প্রকাশ করা হবে। এই বিশেষ সংখ্যার প্রথম লেখা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদের একটি রোমাঞ্চকর শৈশব স্মৃতি। লেখাটি এর আগে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও শিশুদের বইয়ে প্রকাশিত হলেও এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাঠকদের জন্য পুনরায় হাজির করা হয়েছে।
স্মৃতিচারণে হুমায়ূন আহমেদ তার শৈশবের সিলেটের সেই অবিস্মরণীয় বৃষ্টির কথা বর্ণনা করেছেন। ছয়-সাত বছর বয়সে একবার তিনি গুরুতর এক 'অপরাধ' করেছিলেন—বাড়ির কাঠের সিন্দুকের ওপর রাখা পাঁচটি চিনামাটির প্লেট একসাথে ভেঙে ফেলেছিলেন। একটি দরিদ্র পরিবারের জন্য সেই প্লেটগুলোর মূল্য ছিল অনেক। ফলে শাস্তিস্বরূপ তাকে সারাদিনের জন্য ঘরে বন্দী করে রাখা হয় এবং ঘোষণা করা হয় যে, এখন থেকে তিনি প্লেটের বদলে মেঝের পরিষ্কার অংশে ভাত খাবেন। তবে বড়দের কথা ও কাজের অমিল বুঝে তিনি এই শাস্তির ঘোষণাকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। তার ভাইবোন এবং বাড়ির কাজের ছেলে রফিক মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে দেখত সেই বন্দী বালক ঠিকমতো শাস্তি ভোগ করছে কি না। রফিকের কাছে অন্য শিশুদের শাস্তি পাওয়া ছিল এক চরম আনন্দের বিষয়।
দুপুরের খাবারের সময় মুক্তি পেয়েই বালকটি বৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠেন। রফিক তাকে ধরে আনতে ছাতা নিয়ে এলেও, বৃষ্টির তীব্রতা ও মাঠের জমে থাকা পানিতে লাফালাফির উত্তেজনায় রফিক নিজেও সেই খেলায় শামিল হয়। রফিকের নেতৃত্বে শুরু হয় এক দুঃসাহসিক অভিযান। তারা দেয়াল টপকে এমসি কলেজের এক প্রফেসরের বাগানে ঢুকে ঝড়ে পড়ে থাকা আম সংগ্রহ করে এবং পরে একটি পুকুরে স্নানের আনন্দ নেয়। তবে এই সব উত্তেজনার মাঝে রফিক তার ছাতাটি হারিয়ে ফেলে। সন্ধ্যার আগে তারা যখন বাড়ি ফেরে, তখন ছাতা হারানোর কথা কেউ কাউকে জানায়নি, এমনকি বাড়ির সদস্যরাও হয়তো জানতেন না যে রফিক ছাতা নিয়ে বেরিয়েছিল।
বাড়িতে ফিরে বালকটি তার বাবার প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। তার বাবা, যিনি পেশায় পারিবারিক আদালতের প্রধান বিচারপতি ছিলেন, প্রথমে রেডিওতে আকাশবাণীর নাটক শুনতে ব্যস্ত ছিলেন। বালকটি ভেবেছিলেন রেডিওর নব ঘোরানো শেষ হলেই তার শাস্তির চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। কিন্তু অবাক করা বিষয় ছিল, বাবা তাকে কোনো তিরস্কার না করে বরং মায়ের রাগ ভাঙানোর একটি কৌশল শিখিয়ে দেন। তিনি পুত্রকে বলেন, বৃষ্টিতে ভিজলে গায়ের ঘামাচি দূর হয়, তাই মায়ের সামনে এই কথা বলে সবাইকে বৃষ্টিস্নানের আমন্ত্রণ জানাতে।
হুমায়ূন আহমেদ স্বীকার করেছেন যে, পঞ্চাশ বছর আগের এই স্মৃতিগুলো হুবহু মনে না থাকায় তিনি কিছু জায়গায় কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন এবং লেখকের স্বাধীনতা ব্যবহার করেছেন। তবে রফিকের সাথে বৃষ্টিতে ভেজা, ছাতা হারানো এবং পরিবারের সাথে ওই রাতে বৃষ্টিস্নানের উৎসবের মতো মূল ঘটনাগুলো একদম সত্য। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি কোনো উপন্যাস নয়, বরং তার নিজের শৈশবেরই এক টুকরো জীবনচিত্র।




