ভারতীয় সিনেমার আধুনিক ইতিহাসের কথা উঠলে যে ক’জন অভিনেত্রীর নাম সবার আগে চলে আসে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শাবানা আজমি। আজ ১৮ সেপ্টেম্বর এই গুণী অভিনেত্রী ৭৬ বছরে পদার্পণ করলেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত তিনি কেবল পর্দার চরিত্র ফুটিয়ে তোলেননি, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। বিশিষ্ট নির্মাতা শেখর কাপুরের মতে, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে প্রতিটি মোড়ে শাবানা আজমির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাবে। ‘অঙ্কুর’, ‘আর্থ’, ‘মাসুম’ কিংবা ‘মকবুল’-এর মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি নারীর জীবনের অজানা ও জটিল গল্পগুলো পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন।
শাবানার জন্ম ১৯৫০ সালে হায়দ্রাবাদে। কবি কাইফি আজমি ও অভিনেত্রী শাওকত আজমির কন্যা শাবানার শৈশব ছিল বেশ বোহেমিয়ান। বুদ্ধিজীবীদের সান্নিধ্যে বড় হলেও তাঁর পথচলা সহজ ছিল না। স্বনির্ভর হওয়ার তাড়নায় এবং পরিবারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করার সংকল্পে কলেজে ভর্তির আগে তিনি পেট্রোল পাম্পে কাজ করেছেন। সেখানে দিনে মাত্র ৩০ রুপি বেতনে কফি বিক্রি করে নিজের খরচ চালাতেন তিনি। শৈশবে এক ধরণের সংবেদনশীলতা এবং পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে তিনি দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে আরও দৃঢ় ও সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ জাগে ‘সুমন’ চলচ্চিত্রে জয়া ভাদুরির অভিনয় দেখার পর। এরপর ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায় পড়াশোনা করে ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। ১৯৭২ সালে শ্যাম বেনেগালের ‘অঙ্কুর’ ছবির মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় এবং প্রথম ছবিতেই তিনি জাতীয় পুরস্কার জয় করেন। এর মাধ্যমে দর্শক বুঝতে পারেন যে, শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং অভিনয়ের গভীরতা দিয়েও পর্দায় দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সম্ভব। যদিও ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’-র মতো বাণিজ্যিক ছবিতে কাজ করেছেন, তবে তিনি খুব দ্রুত উপলব্ধি করেন যে নাচ-গান নির্ভর মেইনস্ট্রিম নায়িকার চেয়ে ভিন্নধর্মী ও জটিল চরিত্রের অভিনয়ের মধ্যেই তাঁর প্রকৃত সুখ। মৃণাল সেনের ‘খণ্ডহর’ ছবির প্রস্তুতির সময় তিনি মেকআপের কৃত্রিমতা ছেড়ে বই এবং একাকীত্বের মাধ্যমে চরিত্রের যন্ত্রণা ধারণ করার চেষ্টা করেছিলেন।
শাবানা আজমির জীবন ও ক্যারিয়ারের এক বড় মোড় আসে দিল্লিতে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ আয়োজিত ‘নারী ও সিনেমা’ সেমিনারে। সেখানে তিনি উপলব্ধি করেন যে, একজন সফল অভিনেত্রী হওয়ার চেয়ে সমাজের নারীর কথা বলা বেশি জরুরি। এই চিন্তা থেকেই ‘আর্থ’ বা ‘ফায়ার’-এর মতো সাহসী সিনেমার জন্ম হয়, যেখানে নারী চরিত্রগুলো নিজের সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। অর্থের চেয়ে চরিত্রের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিতেন তিনি; অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুর ছবির জন্য বিনা পারিশ্রমিকেও কাজ করতে রাজি হতেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে কবি ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতারের সঙ্গে সম্পর্কটি ছিল গভীর বন্ধুত্বের ওপর ভিত্তি করে।
ক্যারিয়ারের দীর্ঘ পাঁচ দশকে তিনি সমান্তরাল এবং বাণিজ্যিক—উভয় ধারার সিনেমায়ই নিজের ছাপ রেখেছেন। তাঁর সেরা পাঁচ চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম হলো ‘আর্থ’ (১৯৮২), যেখানে তিনি প্রতারিত নারীর আত্মসম্মানের লড়াই দেখিয়েছেন। ‘অঙ্কুর’ (১৯৭৪) ছিল সমান্তরাল সিনেমার এক নতুন দিগন্ত। এছাড়া নিঃসঙ্গতা ও অপূর্ণ প্রেমের গল্প বলা ‘খণ্ডহর’ (১৯৮৪), দারিদ্র্যের নগ্ন বাস্তব ফুটিয়ে তোলা ‘পার’ (১৯৮৪) এবং লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা ‘ফায়ার’ (১৯৯৬) চলচ্চিত্রগুলো তাঁকে মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বর্তমানেও তাঁর কাজের ক্ষুধা অম্লান এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে সাফল্য কেবল বাণিজ্যিক মানদণ্ডে মাপা সম্ভব নয়।




