কেনিয়ার একটি আদালত ১৯১ জনের খুনের দায়ে কাল্ট নেতা পল ম্যাকেঞ্জিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে। নিহতদের মধ্যে মাত্র একজন বাদে বাকি সবাই ছিল শিশু। ম্যাকেঞ্জি এবং আরও ২৭ জন সহযোগীকে এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আদালত জানিয়েছে, ম্যাকেঞ্জি তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তারা তাদের সন্তানদের অনাহারে রেখে মেরে ফেলে, যাতে তারা 'যিশুর সাথে মিলিত হতে পারে'।

২০২৩ সালে কেনিয়া উপকূলের শাকাহোলা বনের অগভীর কবরে ৪০০-এর বেশি মরদেহ উদ্ধারের পর এই তথাকথিত যাজককে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ঘটনাটি কেনিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। মোম্বাসার আদালতে শুনানির সময় প্রসিকিউটররা অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে ম্যাকেঞ্জির মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানালেও আদালত দীর্ঘ কারাদণ্ডের রায় দেয়। প্রসিকিউটরদের মতে, ম্যাকেঞ্জির মধ্যে অপরাধের কোনো অনুশোচনা ছিল না। অন্যদিকে, তার সহ-আসামিদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অনুরোধ জানানো হয়।

আদালতের বিচারক ডায়ানা মোচাশে তার আট ঘণ্টার দীর্ঘ রায়ে জানান, ম্যাকেঞ্জির অনুসারীরা বিশ্বাস করত যে তিনি 'যিশুর মুখপাত্র'। যারা তার এই বিপজ্জনক শিক্ষাকে প্রতিরোধ করেছিল, তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এক সহ-আসামির সাক্ষ্য অনুযায়ী, যারা রোজা রাখার নির্দেশ অমান্য করত, তাদের লাথি ও প্রহারের মাধ্যমে 'স্বর্গে পাঠানো' হতো। বনের ভেতরে দাফন করার প্রক্রিয়াটিকে তারা 'বিয়ে' হিসেবে অভিহিত করত এবং মৃত্যুকে গণ্য করা হতো যিশুর সাথে বিবাহের উৎসব হিসেবে।

ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা গেছে, অধিকাংশের মৃত্যুর কারণ ছিল অনাহার। তবে কেউ কেউ শ্বাসরোধ, গলার ফাঁস বা মাথায় আঘাতের কারণে মারা গেছে। অনেক মরদেহ পচনের কারণে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার হওয়ার পর চরম অপুষ্টির কারণেও অনেকের মৃত্যু ঘটে।

এই ট্র্যাজেডি কেনিয়ার অসাধু ধর্মীয় কার্যক্রমের ওপর নজরদারির অভাবকে সামনে এনেছে। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত কেনিয়া ন্যাশনাল কমিশন অন হিউম্যান রাইটস (KNCHR) জানিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই কাল্টের কার্যক্রমের বিষয়ে বারবার চোখ বুজে ছিল। ভিকটিমদের পরিবারের সদস্য ফ্রান্সিস ওয়ানজে জানান, তিনি ২০২৩ সালের মার্চে পুলিশকে সব জানালেও তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান চালানো হয়নি। তার এক আত্মীয় পুলিশ বাহিনীতে থাকায় এবং এক সাবেক কাল্ট সদস্যের সহায়তায় তার নাতিকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল।

ম্যাকেঞ্জি ২০০৩ সালে 'গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিনিস্ট্রিজ' প্রতিষ্ঠা করেন, যা দীর্ঘ ১৬ বছরে কেনিয়াজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তার নিজস্ব টেলিভিশন চ্যানেল 'টাইমস টিভি'র মাধ্যমে তিনি প্রচার করতেন যে শিক্ষা 'অশুভ', স্বাস্থ্যসেবা 'মতবাদের বিরোধী' এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্র হলো 'শয়তানের চিহ্ন'। ২০১৯ সালে মূল চার্চ বন্ধ করে তিনি শাকাহোলা বনে চলে যান এবং অনুসারীদের সেখানে আসতে উৎসাহিত করেন।

যদিও ১৯১ জনের খুনের মামলায় রায় দেওয়া হয়েছে, তবে বন থেকে উদ্ধার হওয়া মোট মরদেহের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া ম্যাকেঞ্জি এবং তার সহযোগীরা সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ এবং শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার মতো আরও বেশ কিছু মামলার মুখোমুখি রয়েছেন।