হরমুজ প্রণালি ঘিরে ক্রমবর্ধমান সংকটের জেরে কাতার এনার্জি তাদের এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে 'ফোর্স ম্যাজিওর' ঘোষণার মেয়াদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর। খবর ইউরো নিউজের।
কাতারভিত্তিক জ্বালানি জায়ান্টটি পাকিস্তানের ক্রেতাদের জানিয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত এলএনজি চালান বাতিল থাকতে পারে। বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত চালানগুলোতেও সেপ্টেম্বরের পর বিঘ্ন ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের নোটিশ পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি খোলাবাজার থেকেও এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই দেশ থেকেই নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে এক বা দুটি কার্গো এলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। জরুরি ভিত্তিতে আমদানির চেষ্টা চললেও সময়মতো চালান না আসায় দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
ইউরো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার এনার্জির সর্বশেষ যেসব চালান বাতিল হয়েছে, তার সময়সীমা নভেম্বরের প্রথমভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। কেউ ভিন্ন জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, আবার কেউ গ্যাস ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত নয়। ইতালির জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে নভেম্বরের শুরুর মধ্যে নির্ধারিত আরও পাঁচটি এলএনজি চালান সরবরাহ করতে পারবে না কাতার এনার্জি। এডিসনের সঙ্গে কাতার এনার্জির চুক্তির আওতায় এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত বাতিল হওয়া চালানের সংখ্যা ২৯-এ দাঁড়িয়েছে। এসব চালানে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির কথা ছিল। এর মধ্যে ২১টি চালানের বিকল্প ব্যবস্থা করেছে এডিসন, যাতে প্রায় ২০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস ছিল। ফলে গ্রাহকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ সম্ভব হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
কাতার এনার্জি মার্চে প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করে। এরপর পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে প্রতি মাসে মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবো বলেন, রাজনৈতিক সমাধান না হলে এ পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এলএনজি রপ্তানি কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কাতার এনার্জি কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে ইউরো নিউজের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি কাতার এনার্জি।
সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে কাতারের এলএনজি সরবরাহ প্রায় থেমে গেছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি চালান রপ্তানি করেছে, অথচ আগের বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল ৫০৯। এতে কাতারের গ্যাস বিক্রি থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মতো। তবে অন্য রপ্তানিকারকরা ঘাটতির কিছুটা পূরণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে এলএনজি সরবরাহ বেড়েছে, গত এক বছরে নতুন স্থাপনা থেকে উৎপাদনও বাড়ছে। নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াতেও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও কাতার থেকে না পাওয়া এলএনজির ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হচ্ছে না। এশিয়ার কিছু বাজারে গ্যাস ব্যবহার কমেছে বা অন্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে। ইউরোপ স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ দামে এলএনজি কেনার প্রতিযোগিতায় না গিয়ে মজুত করা গ্যাস বেশি ব্যবহার করছে।
অ্যান-সোফি করবোর মতে, যেসব চালান পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো পাচ্ছেন যাঁরা বেশি দাম দিতে পারেন। এলএনজির দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু ক্রেতা বাজারে সক্রিয়। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলএনজি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। অন্য দেশে উৎপাদন বাড়লেও ২০২৬ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ কমে যেতে পারে। সব আমদানিকারক দেশ একইভাবে আক্রান্ত হচ্ছে না। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে, চীনের আমদানিও কমেছে। যেসব দেশ এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং যাদের আমদানির বড় অংশ কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে, তারাই বেশি বিপাকে পড়বে। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ওপর নির্ভরশীল ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি চাপে আছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত। জাপান তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, কারণ তারা কাতারের ওপর অতটা নির্ভরশীল নয় এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নাইজেরিয়ায় নতুন এলএনজি রপ্তানি অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। সেগুলো চালু হলে কাতারের বাইরে থেকে সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। তবে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য আগের মতো স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
হরমুজ প্রণালি খুলে গেলেই যে সমাধান হবে, তা নয়। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হতো। কিছু তেলবাহী জাহাজ এখনো এই জলপথ ব্যবহার করছে, তবে এলএনজি পরিবহনে বিশেষায়িত জাহাজের সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে দ্রুত বিকল্প জাহাজ পাওয়া কঠিন। কাতারের গ্যাস রপ্তানির বিকল্প পথও তেমন নেই। ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া কাতার এনার্জির ১২টি এলএনজি উৎপাদন ইউনিট থেকে উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে প্রায় দুই মাস লাগতে পারে। রাস লাফান এলাকায় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও দুটি ইউনিট মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে কাতার এনার্জি জানিয়েছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সীমিত পরিসরে এলএনজি পরিবহন শুরু হয়েছিল, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নতুন হামলায় জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি আবার বেড়ে গেছে।




