ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা গত এক বছর ধরে তাদের কনটেন্ট মডারেশন বা বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ক্রমশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) হাতে সঁপে দিচ্ছে। এর ফলে ব্রাজিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। যদিও মেটা এই সমস্ত ভুলকে 'প্রযুক্তিগত ত্রুটি' বলে দাবি করছে, তবে অভিযোগকারী হিসেবে সামনে এসেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট, জাতীয় প্রতিবাদ আন্দোলন এবং মার্কিন সিনেট প্রার্থী।

গত বছর ২০১ বিলিয়ন ডলার আয় করা এই ফরচুন ৫০০ কোম্পানিটি এখন মানব পর্যালোচকদের বদলে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (LLM) ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। গত মার্চ মাসে মেটা আরও উন্নত এআই এনফোর্সমেন্ট সিস্টেম চালুর কথা জানায়। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, জুন মাসের মধ্যে প্রায় অর্ধেক রিভিউ রিকোয়েস্ট এআই-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। মেটার লক্ষ্য ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরিতে ৯০ শতাংশ বা তার বেশি অটোমেশন নিশ্চিত করা। মেটার দাবি, এআই মানব পর্যালোচকদের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম ভুল করে এবং ১০ শতাংশ বেশি নিয়ম লঙ্ঘন শনাক্ত করতে পারে। তবে কোম্পানির কিছু কর্মী সতর্ক করেছেন যে, পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই খুব দ্রুত এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

২০১৮ সালে ব্রাজিল ও মার্কিন নির্বাচনের আগে ফেসবুক বিশেষজ্ঞ দিয়ে একটি 'ওয়ার রুম' তৈরি করেছিল। আট বছর পর এখন সেই নাম বদলে রাখা হয়েছে 'ইলেকশন অপারেশনস সেন্টার', তবে সেখানে মানুষের বদলে সফটওয়্যারের আধিপত্য বেড়েছে। ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, দ্রুত পরিবর্তনশীল নির্বাচনী চক্রে মানব তদারকির বদলে এই ধরনের অটোমেটেড সিস্টেমের ওপর নির্ভর করা একটি অপ্রীক্ষিত ঝুঁকি।

ব্রাজিলের উদাহরণে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে অনলাইনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মেটার বিরুদ্ধে। লুলার প্রচারণা দল অভিযোগ করে যে, মেটার অটোমেটিক ট্রান্সলেশন সিস্টেমের ভুলের কারণে প্রতিপক্ষ ফ্লাভিয়ো বলসোনোর বিরুদ্ধে করা মন্তব্যগুলো ভুলভাবে অনুবাদ করা হয়েছে এবং লুলার পোস্ট শেয়ার করার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়েছে। ব্রাজিলীয় উচ্চ আদালত মেটাকে নির্দেশ দেয় দুই প্রার্থীর সাথেই সমান আচরণ করতে, অন্যথায় প্রতিদিন ৫ লক্ষ রিয়ালের জরিমানা করা হবে। যদিও মেটা কোনো বৈষম্যের কথা অস্বীকার করেছে, তবুও ফেডারেল প্রসিকিউটররা মেটার বিরুদ্ধে সিভিল মামলা দায়ের করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে 'নো কিংস' নামক একটি জোটের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ভোটাভুটি উৎসাহিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে মেটা একে অস্বাভাবিক পোস্টের হার বলে ব্যাখ্যা করলেও পরে জানায়, ক্লাউড (Claude) নামক একটি এআই টুল ব্যবহার করায় তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা ভুলবশত অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পাশাপাশি ফ্লোরিডার সিনেট প্রার্থী অ্যাঞ্জি নিক্সনের ল্যাটিনো ভোটারদের জন্য তৈরি একটি স্প্যানিশ অ্যাকাউন্টকেও মেটা ভুল করে 'ইম্পারসোনেশন' বা ছদ্মবেশ ধরে নেওয়ার অভিযোগে সরিয়ে ফেলে।

মেটার নিজস্ব ওভারসাইট বোর্ড এই ধরনের বারবার ব্যর্থতাকে সমালোচনা করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং হাউজ ওভারসাইট ও জুডিশিয়ারি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া এবং জেমি রাস্কিন এই ঘটনার স্বচ্ছতা চেয়েছেন। তারা জানতে চেয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে এই বিষয়ে মেটার কোনো যোগাযোগ ছিল কি না। বর্তমানে ব্রাজিলের আদালতের সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে মেটা এই প্রশ্নের কতটা জবাবদিহি করবে।